এদুয়ারদো গালেয়ানো বলছেন ১৯৬২-তে সাত বছর যুদ্ধের পর আলজিরিয়া যখন স্বাধীনতার দিকে পা বাড়াচ্ছে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশন্যাল তৈরি হচ্ছে যে বছর আর মেরিলিন মনরো যে বছর হারাচ্ছেন তার বেঁচে থাকার ইচ্ছে, এলভিস প্রেসলি অবসর ঘোষণা করছেন (যদিও তিনি মত বদলাবেন দ্রুত) আর ইংল্যান্ডের দেক্কা নামের এক রেকর্ড কোম্পানি বিটলস বলে এক দল লম্বাচুলো গায়কের গান রেকর্ড করতে অস্বীকার করছে, ব্রাজিল ফুটবল দল চিলিতে আসছে সন্তম বিশ্বকাপ খেলতে৷ এই বিশ্বকাপে খেলতে নামার আগেই আহত হয়ে সরে যেতে হবে ডি স্তেফানোকে৷ চোট পেয়ে বসে যাবেন প্রবাদপ্রতিম লেভ ইয়াসিন আর আগের কাপেই অভিষিক্ত যুবরাজ পেলে৷ সমস্ত রক্ষণভাগের মধ্যে দিয়ে উড়ে যাওয়ার দায়িত্ব পড়বে গ্যারিঞ্চার ওপর৷ ইংল্যান্ডের কাগজগুলো মুগ্ধ বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করবে তুমি কোন কাননের ফুল? কিন্তু জীবনের সমস্ত মালিন্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার এই ফুটবল খেলাই হত না যদি না ১৯৫৮-র ব্রাজিল বিশ্বকাপ দলের সদস্যরা বিদ্রোহ না করত কোচের বিরুদ্ধে৷ সেই বিদ্রোহের ফলেই প্রথম একাদশে না নেওয়া পেলে, গ্যারিঞ্চা ইত্যাদি পাঁচজনকে কোচ নিতে বাধ্য হন আর লক্ষ লক্ষ মানুষের বুকে জায়গা করে নেয় ব্রাজিলিয় ফুটবল৷ লোকে বলে ষষ্ঠ আর একজন ছিল এই বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ৷ অধিনায়ক ডিডি তাকে মনেপ্রাণে চেয়েছিল পেলে আর গ্যারিঞ্চার পাশে৷ কিন্তু প্রথম বাইশজনের মধ্যে তার নাম রাখাই হয়নি কারণ কর্তাদের চোখে সে এক অমার্জনীয় অপরাধের অংশীদার৷ অরেলিয়ানো রোজারিও বিশ্বাসের কথা আমাকে প্রথম বলেন আমার এক লাতিন আমেরিকা পাগল মাস্টারমশাই৷ অরেলিয়ানো কর্নেল সুরেশ বিশ্বাসের নাতি৷ আরেলিয়ানোর বাবা গাব্রিয়েল বিশ্বাসের নাম কর্নেল বিশ্বাসের বংশপঞ্জিতে খুঁজে পাওয়া যাবে না৷ আমরা নিশ্চিত নই কে গাব্রিয়েলের মা৷ রেঙ্গুনে যে মহিলাকে সুরেশ আগুন থেকে বাঁচিয়েছিলেন কিংবা তার সার্কাসের দলের যে চোদ্দো বছরের জার্মান মেয়েটির সঙ্গে তার সুগভীর প্রণয় পর্ব চলেছিল বা নিতেরয়ের যে যুদ্ধে অসীম বীরত্ব প্রদর্শন করে তিনি কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং সেই যুদ্ধে আহত হলে তাকে শুশ্রূষা করে সারিয়ে তোলেন যে মহিলা তারা যে কেউ গাব্রিয়েলের মা হতে পারেন৷ সমঝদাররা বলেন অরেলিয়ানোর খেলা থেকেই পরিষ্কার ব্রাজিল ছিল তার রক্তে৷ আর আর একটি অস্থিরতা ছিল তার রক্তে৷ ব্রাজিল, কলম্বিয়া আর পেরুর সীমান্ত এসে মিলেছে যে কোণাটায় আমাজন নদীর পারে সেখানে- সান পাব্লোয়- ছিল এক কুষ্ঠরোগীদের বসতি৷ ১৯৫২ নাগাদ সেখানে এসে পৌঁছায় দুই আরজেন্তিনিও চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্র- আলেবরতো আর এরনেস্তো৷ এরনেস্তোর চব্বিশতম জন্মদিনের যে পার্টি হয় অরেলিয়ানো তাতে কোনোক্রমে রক্ষা পায়৷ বিকেলের ফুটবল ম্যাচে চার গোল মেরেছিল অরেলিয়ানো৷ তার মধ্যে একটা নার্স সিলিয়া আমোরেত্তির ক্রস থেকে শূন্যে লাফিয়ে ব্যাক হিল করে৷ এই গোলটির পরে মাঠ জুড়ে যে উন্মাদনা চলে তাতে প্রায় পূর্ব নির্ধারিত হয়ে যায় রাতের পার্টিতে সিলিয়া কার সঙ্গে নাচবে৷ কিন্তু নাচ শেষে অরেলিয়ানো যখন ঘরের উদ্দেশে রওনা দেয় তখন তার আলিঙ্গনে ছিল ডাক্তার রোজা গাইতান৷ খুব স্বাভাবিকভাবেই সিলিয়াকে সার্জারি থেকে একটি স্ক্যাল্পেল ধার করতে হয় এবং কুষ্ঠরোগীদের কুঁড়েগুলোর মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ গাছের ছায়ান্ধকার মাটির রাস্তাগুলোর একটায় অরেলিয়ানো আর রোজার মুখোমুখি হয় সিলিয়া৷ যদি না এরনেস্তো সেখানে এসে পড়ত আর সিলিয়াকে যথেষ্ট পরিমাণে নিবারণ না করতে পারত তা হলে এই গল্পের এখানেই ইতি হত৷ এরনেস্তোর সঙ্গে দীর্ঘ দোস্তির এই শুরুয়াত৷ ১৯৫৪ সালে আবার একটা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে দ্যাখা হয় দু'জনের গুয়াতেমালায়৷ প্রেসিডেন্ট আরবেঞ্জ অনেক ভোটে জিতে সাপের পাঁচ পা দেখেছেন৷ ব্রত নিয়েছেন ভূমিসংস্কারের৷ আর যাদের হাতে হাজার হাজার একর জমি তার মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি- আমেরিকার সিআইএ-র বড়োকর্তা আর রাষ্ট্রদূত ডালেস ভাইদের কোম্পানি৷ সুতরাং আমেরিকা এক ভাগ্যান্বেসী সৈনিককে অস্ত্রশস্ত্র, বোমারু বিমান, ভাড়াটে সৈন্য আর টাকা পয়সা দিয়ে শুরু করেছে আরবেঞ্জ-বিরোধী অভিযান৷ বলা বাহুল্য মূর্খ জনগণ আরবেঞ্জের পক্ষে আর অরেলিয়ানো আর এরনেস্তোও সেই দিকে৷ অচিরেই পতন আরবেঞ্জের৷ এরনেস্তো প্রাণ বাঁচিয়ে পাড়ি দিল মেক্সিকো৷ জোনাস সাল্ক সে বছর পোলিও ভ্যাকসিন বার করছেন, আলজেরিয়ার স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হচ্ছে আর ব্রাজিল প্রথম বার তাদের ক্যানারি হলুদ জার্সি পরে নামছে৷ সেমিফাইনালে হাঙ্গেরির কাছে হারবে ব্রাজিল আর তার ফুটবল কর্মকর্তারা চিরকাল মনে রাখবে অরেলিয়ানো এই সময় প্রেসিডেন্ট আরবেঞ্জের হয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলছিল৷ ১৯৫৮-তে তাই ভাবাই হয়নি অরেলিয়ানোর কথা৷ ১৯৫৬য় যখন এরনেস্তো আর আরও উনআশি জন হবু যোদ্ধাকে নিয়ে রওনা দিল গ্রানমা কিউবার উদ্দেশে অরেলিয়ানো তার যাত্রী হতে পারল না৷ মেক্সিকো সিটির সান মিগেল র্যাঞ্চে জেনারেল বায়োর কাছে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেওয়ার দলেও ছিল অরেলিয়ানো৷ প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবেই র্যাঞ্চের খুব কাছের আগ্নেয়গিরি পোপোকাটাপেটল-এর মাথায় উঠেছিল অরেলিয়ানো৷ র্যাপল করে নামার সময় দমকা হাওয়া দড়ি শুদ্ধু বাড়ি দিল পাহাড়ের গায়ে৷ বাঁ পা ভেঙে মেক্সিকোয় পড়ে থাকল অরেলিয়ানো৷ রাশিয়ানদের স্পুতনিক এর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্যে যে বছর আকাশে প্রথম উপগ্রহ পাঠাচ্ছে আমেরিকা, লেবাননে গৃহযুদ্ধ শুরু হচ্ছে আর বাজারে প্রথম বেরোচ্ছে বারবি ডল, সুইডেনে রাজা গুস্তাভাস এডোলফাস এর বিস্ফারিত চোখের সামনে বিশ্বকাপ ফাইনালে সুইডেন দলকে ৫-২ গোলে হারাবে ব্রাজিল৷ সেমিফাইনালে ফ্রান্সকেও পাঁচ গোল দিয়েছিল তারা৷ টুর্নামেন্টের শুরুটা কিন্তু তারা করেছিল একদম ম্যাড়ম্যাড়ে৷ শোনা যায় অরেলিয়ানো রাত দেড়টায় টোকা দিয়ে ঢোকে কোচের ঘরে৷ বলে, পেলে নামের বাচ্চাটাকে খ্যালাচ্ছ না কেন? সম্ভবত তারই উসকানিতে খেলোয়াড়েরা কোচকে বলে কাকে কাকে খেলানো উচিত৷ ফাইনাল শেষ হলে উধাও হয়ে যায় অরেলিয়ানো৷ ১৯৫৮-র গ্রীষ্মে অরেলিয়ানোর দোস্ত এরনেস্তো বাতিস্তা বাহিনীর সব থেকে বড়ো হামলাটা সামলাচ্ছিল৷ তার পর ৩১ অগস্ট যখন সিয়েরা মায়েস্ত্রার পর্বত গৃহ ছাড়ি প্রথমে সান্তা ক্লারা আর তার পরে হাভানার উদ্দেশে বয়ে যাবে এরনেস্তো চে গেভারার আর ক্যামিলো সিয়েনফুগোসের গেরিলা বাহিনী তাদের মধ্যে দেখা যাবে অরেলিয়ানোকে৷ চে-র বাহিনীতে খুব গাওয়া হত যে গান- 'পাশে না দাঁড়িয়ে আজ মাঠে নামো / তবে খোলা মাঠে হোয়োনা পপাত / ওই দেখো চে-র হাতে দুনিয়াটা / বদলায়, কেয়াবাত্, কেয়াবাত্' - সেটা নাকি অরেলিয়ানো রচিত৷ বোঝাই যাচ্ছে ফুটবল যেমন খেলত কবিতা তেমন লিখতে পারত না অরেলিয়ানো৷ সান্তা ক্লারায় তিনহাজার সেনা জড়ো করেছিল বাতিস্তা৷ চে-র হাতেও লোক নেহাত কম নয়- সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিনশো৷ তাই প্রায় পুরো দু'দিন লেগে গেল সান্তা ক্লারা মুক্ত হতে৷ ১৯৫৯-র শুভ নববর্ষে যখন বাতিস্তা পিটটান দিল নতুন দেশ নতুন প্রেমিকা নিয়ে চে-র আর ফুরসত রইল না৷ কিছু দিনের মধ্যেই একঘেঁয়েমি এসে গেল অরেলিয়ানোর৷ ১৯৬১-তে একটা সুযোগ এসে গেল৷ সে বছর তার দাদার শতবর্ষ৷ বহুদূর এর দেশ ভারতে হাজির হল অরেলিয়ানো৷ খুঁজে খুঁজে নদীয়ায় গেল৷ তার পর এল কলকাতায়৷ অরেলিয়ানোদের বাড়িতে দাদা-র ছবি ছিল একটা৷ মিলিটারি কোটের ওপর সারি সারি মেদেল লাগানো, মোম দিয়ে মাজা পাকানো গোঁফ৷ অল্প বয়সেই বাড়ি থেকে পালিয়ে, লুকিয়ে জাহাজে উঠে রেঙ্গুন হয়ে বিলেত পৌঁছনো, ক্রমে সার্কাসে খেলা দেখিয়ে আমেরিকা যাওয়া আর তার পর ব্রাজিলের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে কর্নেল হয়ে ওঠা- শুনে শুনে মুখস্থ অরেলিয়ানোর৷ গ্যাব্রিয়েল হয়ত একটু অভিমান পোষণ করতেন বাবার সম্পর্কে৷ কিন্তু অরেলিয়ানো যখন ডানপিটেমিতে দাদুকে পাল্লা দিতে শুরু করল বোধ হয় খুশিই হয়েছিলেন গাব্রিয়েল৷ আর অরেলিয়ানো ভাবত আচ্ছা, কোনটা বেশি কঠিন, ট্রাপিজের দোলনায় শরীরটাকে হাওয়ায় ছুড়ে দিয়ে একটা পাক খেয়ে ও দিকের দোলনাটাকে পা দিয়ে লুফে নেওয়া না কি কর্নার ফ্ল্যাগের দিক থেকে কেটে এসে প্রথম ডিফেন্ডারের সামনে পায়ের পাতা দিয়ে বলটাকে চাপড়ে মাথার ওপর তুলে নিয়ে বাঁ ঊরুর একটা ছোট্টো টোকা দিয়ে ডান পায়ের গোড়ালির ওপর সম্পূর্ণ ঘুরে গিয়ে একটা নিখুঁত ভলিতে গোল দেওয়া৷ অরেলিয়ানো জানত দাদু এক জন বীর৷ কিন্তু দেখল দাদুর দেশে দাদুকে কেউ মনেই রাখেনি৷ ঠাকুর বলে কে এক জন কবির শতবর্ষ পালিত হচ্ছে খুব ধুমধাম করে৷ কবিতা পড়ে বুঝবার মতো বাংলা শেখা হয়নি অরেলিয়ানোর৷ তবে তার দোস্ত এরনেস্তো পাবলো নেরুদা বলে একজনের কবিতার বই রুকস্যাকে নিয়ে ঘুরত৷ একটা বইয়ের নাম কুড়িটি প্রেমের কবিতা আর একটি গান৷ এরনেস্তো বলেছিল বটে সেই গানটা নাকি অরেলিয়ানোর দাদার দেশের রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর নামে এক কবির লেখা৷ তার গোটা ভবঘুরে জীবন জুড়ে যে ডাইরি লিখেছে অরেলিয়ানো সেগুলো তার দাদাকে উদ্দেশ্য করে লেখা কতগুলো কল্পিত চিঠি৷ কোনো কথা লুকোয়নি কখনও সে৷ কিন্তু তার অতিপ্রিয় মৃত দাদাকে সে কিছুতেই লিখতে পারল না যে ভারতে সবাই তার কথা ভুলে গেছে৷ আর সেই ডাইরি আমারও কোনো দিন পড়া হল না কেননা এই চিঠিগুলো স্মৃতির ডাকবাক্সে কোনোদিন ফেলাই হয়নি৷
No comments:
Post a Comment