তা টেনে ধরে। দলের প্রতিষ্ঠার সময়ের আরেক নিশাচর মফিজুর রহমান রোমন। তারও পিছুটান ছিল না। তবে বিয়ে করার পর একটা বিয়েটান তৈরি হয়েছে। তারপরও আমরা তিনজন ছিলাম রাতপাগল। ঝুঁকি নেয়ার আহ্লাদ করে বেরিয়ে যেতাম রাতের অন্ধকারে। অনেক ঝুঁকির আহ্লাদই পুরণ হয়েছে আমাদের। তবে মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে ভেতরটা উঁকি দেয়ার সৌভাগ্য হলো না রোমনের। অবশ্য রোমন এটাকে সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য বলবে, সেটাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এর আগের বেশ কয়েকটা ট্রিপের মতো ১৬তম ট্রিপেও আমাদের সাথে রোমন ছিল না। দিনটা ছিল ২২ অক্টোবর (২০১৪)। বিকেল পাঁচটা। নিশাচর জাফর হায়দার তুহিন, সাইমুম সাদ এবং আরিফ সরকারসহ চার নিশাচর হাজির হলাম কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে। গন্তব্য অজানায়। ট্রেনে উঠবো, যেখানে ইচ্ছে হয়, সেখানেই নেমে যাবো। কিন্তু আমাদের ইচ্ছে হওয়ার আগেই অন্য একটি ইচ্ছে এসে চেপে বসলো। সেটা ভাগ্যের ইচ্ছে। এই ভাগ্যের ইচ্ছেটা কর্পুরের মতো উড়িয়ে নিয়ে গেল আমাদের অতীত এবং বর্তমানকে। এর জন্য কে দায়ী? আমি, তুহিন, আরিফ, নাকি সাদ? ঘটনার পূর্ণ বিবরণ জানার পর অবশ্যই প্রথম তিনজনকে দায়ী করা যাবে না। তবে সাদের দিকে সন্দেহের আঙুল কিছুটা হলেও উঠতে পারে। যদিও আমাদের উড়াল ডানাগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছিল সাইমুম সাদ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের মতো তার দুই পাশেও ডানা গজালো না কেন? তাহলে কি সেই উড়াল কারিগরদের সাথে যোগসাজশ ছিল সাইমুম সাদের? সেটা যদি থেকেই থাকে, তবে আমাদেরকে মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরিয়ে আনার কথা নয় তার। একটার পর একটা প্রশ্ন এসে জট পাকাচ্ছে নিশাচরদের মাথায়। তবে কোনোটারই কিনারা করা যাচ্ছে না। সন্দেহ হচ্ছে সেই রুমার প্রেমে ছ্যাঁকা খাওয়া রহস্যমানব সাজনকেও। সবই রহস্য। উড়ালবাহনে ওঠার পর রহস্যজনকভাবেই সাজনের সাথে পরিচয়। উড়াল বাহন মানে বিমান নয়। সেদিনের জন্য কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি ট্রেনই ছিল নিশিদলের উড়ালবাহন। কারণ আমরা জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জগামী এ ট্রেনটির ছাদে চড়ে বসেছিলাম। যাত্রা করেছিলাম উড়তে উড়তে। ছাদে ওঠার পেছনের কাহিনীটাও রোমাঞ্চকর। সেই বিকেল পাঁচটা থেকে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা। যেকোনো ট্রেনে উঠতে পারলেই হলো। কিন্তু ট্রেন আসছে যাচ্ছে কোনোটাতেই সিট খালি নেই। আবার দিনটি বুধবার হওয়ায় ট্রেনের সংখ্যাও কম। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। হুঁইসেল বাজিয়ে কমলাপুর স্টেশনে এসে ভিরছে একেকটি ট্রেন। কিন্তু মানবজট ঠেলে উঠতে পারছি না। আবার কোনোটা হাঁপাতে হাঁপাতে স্টেশনে আসছে। আমরা আশা নিয়ে এগিয়ে যাই। অতঃপর হতাশ হই। অধিকাংশ ট্রেনই ফিরতি যাত্রা করবে না। কিন্তু আমাদের তো এখানে বসে থাকলে চলবে না। তাই নতুন নতুন প্রেনের খোঁজ করতে শুরু করলাম। সময় গড়াচ্ছে, আমাদেরও ট্রেনে ওঠা হচ্ছে না। হঠাৎ দেখলাম খুলনাগামী ট্রেন চিত্রা একপ্রেসের ইঞ্জিন চালু হয়েছে। আমরা প্রতিটি কামরার দরজায় ছুটাছুটি করে ওঠার চেষ্টা করলাম, পারলাম না। ব্যর্থ হয়ে এগিয়ে গেলাম ইঞ্জিনের দিকে। ওটার দুই পাশে একটু যায়গা অতিরিক্ত থাকে। সেখানে ওঠে বসা যেতে পারে, প্রস্তাব দিলো তুহিন। এই লম্বামতো যায়গাটার পাশে নিরাপত্তার জন্য একটি রেলিংও রয়েছে, বোঝানোর চেষ্টা করল সাদ। কিন্তু ইঞ্জিনের ধুকপুকানির ভয়ে আমার ভেতরটায়ও ধুকপুক শুরু হলো। তা ছাড়া ওখানে ওঠে বসলে ইঞ্জিনের গরমটাও এক সময় অসহ্য লাগতে পারে, বললো আরিফ। উঠবো কি উঠবো না করতে করতে শেষবারের মতো হুঁইসাল বাজালো চিত্রা এক্সপ্রেস। এরপরই কেঁচোর গতিতে চলতে শুরু করল। আমরা আবারো হতাশ হয়ে বিপরীত দিকে ঘুরলাম। তবে কী কারণে যেনো একবার পেছন দিতে তাকালাম। অবিশ্বাস্য কাণ্ড, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কোত্থেকে যেনো উড়ে এলো একটা মানব স্রোতে। মুহুর্তেই মৌচাকের মতো ঘিরে ধরলো চিত্রা এক্সপ্রেসের মস্তকটাকে। আমাদের মস্তকে কিছুই খেলছিল না। কি করবো ভেবেও পাচ্ছিলাম না। ভাবতে ভাবতে যখন হতাশ, ঠিক তখনি গমগম করে উঠলো স্টেশনের সাউন্ডবক্স। ভেসে এলো ঘোষক মহিলার গলা। তিনি জানালেন, এক নাম্বার প্লাটফরমে দেওয়ানগঞ্জগামী একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওটা ছেড়ে যাবে। কালো পোশাক পরিহিত নিশিদলের চার নিশাচর দৌড়ে গেলাম এক নাম্বার প্লাটফরমে। দেখলাম ওটার ইঞ্জিন চালু হয়েছে। তিন-চারটা মাত্র কামড়া। তার ওপর ওগুলো আগেই দখল করে রেখেছে নিয়মিত যাত্রীরা। একটার ভেতরে উঠলাম। পা ফেলার যায়গা পেলাম বটে, তবে মনে হলো ট্রেন ছাড়ার পর পা দুটো নাড়াচাড়া করার সুযোগ হবে না। বিষিয়ে উঠলো মন। তবে আমার চেয়েও বেশি বিরক্তি দেখালো আরিফ। অবশেষে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম ছাদে চড়বো। কিন্তু চড়বো কিভাবে? তাকালাম ছাদটার দিকে। মনে হলো পাহাড়ের মতো উঁচু। তবে লোকগুলোকে দেখলাম কেমন তরতর করে উঠে যাচ্ছে। সহস এলো কিছুটা। সবার আগে এগিয়ে গেল পিছুটানহীন তুহিন। দরজার হাতলের ওপর কোনোরকম পা দুটো ঠেকিয়ে ওখানেই আটকে গেল সে। নিচ থেকে আমরা যে সাহায্য করবো সে উপায়ও নেই। ভাগ্য ভালো ছিল ছাদের ওপর কোত্থেকে যেন এক ভদ্রলোক এসে তুহিনের হাতটাকে টেনে ধরলো। ব্যস, সহজেই ওঠে গেল সে। এরপর ওঠার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হলো আমাকে। কারণ ঝুঁকিপূর্ণ ওঠানামার ব্যাপারে আমার আনাড়িপনা সম্পর্কে ওদের ধারণা আছে। তাই আমি উঠতে পারলে ওদের ভেতরও একটা আত্মবিশ্বাসের তৈরি হয়। বীরদর্পে এগিয়ে গেলাম আমি। প্রথমে পা রাখলাম ট্রেনের পা দানিতে। ঘামে ভেজা হাত দুটো দিয়ে আঁকড়ে ধরলাম হাতল দুটো। কিন্তু বার বারই মনে হলো পিছলে যাচ্ছি। পেছন থেকে সাহস যোগালো সাইমুম সাদ। আরিফ এসে নিচ থেকে ঠেলে ধরলো আমাকে। কিন্তু আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়)। আরিফ যতই ঠেলছে, আমি ততই ঘাবড়ে যাচ্ছি। ওদিকে ওপর থেকে আমার উদ্দেশে হাত বাড়িয়ে আছেন সেই ভদ্রলোক এবং তুহিন। কিন্তু তখনো ওদের হাতের নাগাল পাওয়ার মতো অবস্থায় আসতে পারিনি। দুই দিক থেকেই অপমানজনক বাক্য ছুটে আসছিল। এ অপমান সহ্য করা যায় না। সাহস করে বাম পাটা তুলে দিলাম আরো একটু ওপরে। সাথে সাথেই ওরুর রগে টান লেগে গেল। আমি তখন ফ্রিজ হওয়ার অবস্থা। ঢালু ছাদটার নিচের দিকে কার্ণিশের মতো একটা কিছু ধরতে পারলাম। একদিকে হাতের ওপর ভর করে ওপরে উঠার চেষ্টা করছি, অন্যদিকে তুলে দেয়া পা দুটোর ওপরও ভর দেয়ার চেষ্টা আছে। কিন্তু দুই রকমের চেষ্টাই বিফল। রগের টান বেড়ে বাম পা টা আরো টনটনে হয়ে উঠলো। এ তথৈবচ অবস্থা দেখে সহ্য হলো না তুহিনের। এগিয়ে এসে আমার হাতটা টেনে ধরতে চাইলো। কিন্তু তুহিনের ওপরও আস্থা হলো না সেই ভদ্রলোকের। তিনি তুহিনকে বায়ে রেখে শক্ত করে আমার হাতটাকে ধরলেন। অন্য দিকে আমার আস্থার মাত্রাটাও শূন্যের কাছাকাছি। কারণ ভদ্রলোকের হাতের তালু শুকনো থাকলেও এতক্ষণের কাণ্ডে আমার কব্জি ঘেমে গেছে। তাই শুরু হলো পিছলাপিছলি। আমি পুরো শরীরটাকে ছাদের সাথে এলিয়ে দিলাম। এরপর একটা ভারি বস্তাকে যেভাবে টেনে তোলো হয়, সেভাবেই আমাকে তুললেন ভদ্রলোক। এবার আমার দেখার পালা। কিন্তু লিকলিকে সাইমুম সাদ আমাকে হতাশ করে দিয়ে ভদ্রলোকের হাতের এক হ্যাঁচকা টানেই উঠে গেল। তবে আমার অপমানটাকে কিছুটা হলেও ঢেকে দিল আরিফ। তাকেও সবাই মিলে একরকম বস্তার মতোই টেনে তুললাম। আমরা উদ্ধার হলাম বটে। তবে সেই উদ্ধারকারীকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের ওপর বর্তে গেল অন্য একজনকে উদ্ধারের কাজ। সেই অন্য একজনের নামই সাজন। প্লাটফর্ম থেকে টেনে তুলার পর আমাদের গা ঘেঁষেই বসলো সাজন। চলতে শুরু করল ট্রেন। উড়াল দিলাম আমরা। ঝির ঝির করে বাতাসটা বিপরীত দিকে ঠেলতে শুরু করল। প্লাটফরম ছাড়িয়ে খিলগাঁও রেলগেট, এরপর মগবাজার রেলগেট পেরিয়ে অন্যরকম একটা গতি পেলো উড়ালবাহন। সেই গতিটা আরো বাড়ল এয়ারপোর্ট স্টেশন ছাড়িয়ে। আর টঙ্গি ছেড়ে যাওয়ার পর একেবারেই অন্যরকম। বলা যায় উড়ালপঙ্খী। ঝিক ঝিক শব্দটা আমাদের কানে এসে ঠেকল বিষাক্ত সাপের হিসহিসের মতো। নিশিদল উড়ছে সাপের পিঠে চড়ে। হু হু বাতাস। প্লাটফরম থেকে ছেড়ে যাওয়ার পর কিছু সময় হইচই করে কাটালেও হঠাৎ করেই নিশিদলের ওপর বিষন্নতা ভর করল। বিষন্ন নিশিদলকে উড়াল জগতে নিয়ে গেল বাতাস। আমাদের চেয়েও বেশি উড়ল সাজন। কিছুদিন হলো ওর প্রেমিকা রুমার বিয়ে হয়ে গেছে অন্য এক ছেলের সাথে। রুমা ছাড়া সাজন একেবারেই অসহায়। গান ধরলো সে- আমি সাজন মইরা যামু রুমা হারা হইয়ারে / ভ্রমর কইয়ো, কইয়ো গিয়া... সাজন এখন ২৪ ঘণ্টাই নেশার ওপর থাকে। একটু আগে কলকি টেনে এসেছে। আশপাশের অনেকেই টানছে। একদিকে বিষাক্ত সাপের হিসহিসানি। অন্য দিকে কলকির কড়া ঘ্রাণ। সব মিলিয়ে আমরা হয়ে গেলাম ভাবুক নিশাচর। ভাবছি এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে। ভাবছি সাজনকে নিয়ে। ওর বাড়ি কিশোরগঞ্জের মজলিশপুরে। একেবারে আমার বাড়ির কাছাকাছি। কিন্তু বাড়ির পরিচয়টা গোপন করে গেলাম। হয়তো আমার বাবা চাচাদের চিনেও ফেলতে পারে। সাজন আমাকে চিনে ফেললে সমস্যার কী আছে? সমস্যার তেমন কিছু নেই। তবে পরিচয়টা পেলে হয়তো খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসবে না সে। আর খোলসের ভেতর বন্দী শামুককে নিয়ে কোনো গল্পই হয় না। সাজন বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে কিছুদিন হলো। ওর ভীষণ অস্থিরতা। মেয়ে জাতের প্রতি তীব্র ঘৃণা। ওরা কথা দিয়ে কথা রাখে না। একজনের সাথে প্রেম করে দিব্যি অন্যজনের হাত ধরে চলে যায়। সাজনকে ছেড়ে চলে গেল রুমা। তাই সে গান ধরলো, চলে গেছো তাতে কি / নতুন একটা পেয়েছি / তোমার চেয়ে অনেক সুন্দরী... হ্যাঁ, আজ সে নতুন একজনের সাথেই দেখা করে এলো নারায়ণগঞ্জ থেকে। তবে নতুন জনের প্রতি কোনো মোহ নেই। ইচ্ছে হলো দেখা করল, এই আরকি। সাজনের চেহারা নমুনাও উন্নত। গায়ের রঙ ফর্সা। খাড়া নাসিকা। পুরুষালি আবেদনময়ী চোখ। গায়ে তার ফুলহাতা শার্ট। বুকের বোতাম খোলা। পরনে জিন্স। তাই নিজেকে নিয়ে গর্ব করতেই পারে সে। সাজন বললো, আমি চাইলে যে কোনো ইস্টিশনে নাইম্যা একটা মাইয়া পটায়া লইয়া আইতারাম। আমি চুপ রইলাম। কিন্তু এতে সন্তুষ্ট হলো না সে। বললো, কি বড় ভাই, আমার কতা বিশ্বাস করলাইন না? সাজনের সব কথাই বিশ্বাস হচ্ছিল আমার। সে মিথ্যে বলছে না। রুমা হারা সাজনের জন্য খুব মায়া হলো। ভাবলাম, রুপকথার দৈত্যকে ডাক দিয়ে বলি, রুমাকে সাজনের কাছে এনে দিতে। কিন্তু সেই ইচ্ছেটাও বাতিল করতে হলো একটা স্টেশনে যাওয়ার পর। কেন, কী ঘটলো সেখানে? তেমন কিছুই না। স্রেফ একটু ইভ টিজিং। ট্রেনটা ঝির ঝির করতে করতে প্লাটফরমে স্থির হলো। নিচে কিলবিল করছে যাত্রীরা। হঠাৎ দেখলাম আমার পাশ থেকে উঠে গেল সাজন। ঝুঁকে তাকালো প্লাটফরমের নিচে। আমাকে ইশারা করে একটা কিছু দেখাতে চাইলো। তাকিয়ে আহামরি কিছু দেখলাম না- সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে আছেন দুইজন। একজন ছেলে, অন্যজন মেয়ে। দেখে যথেষ্ট ভদ্রই মনে হলো। কিন্তু সাজন ওদের প্রতি এমন কৌতুহলী হয়ে উঠল কেন? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু তার আগেই জবাবটা পেয়ে গেলাম। একটা অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি দেখিয়ে সে চিৎকার করে উঠলো, হাই ...ক্সি। ওইখানে একজনের লগে বইসা কি করো? ছাদে উইঠা আইয়ো। আমার আরো চাইর বড় ভাই আছে। সেই থেকে শুরু। এর পর যেখানেই কোনো মেয়ে দেখছে বাজে মন্তব্য করছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিব্রত হচ্ছে সাইমুম সাদ। আরিফ, আর তুহিনেরও খুব একটা পছন্দ হচ্ছে না সাজনকে। আমার পছন্দ বা অপছন্দে কিছুই আসে যায় না । সাজনের কাজ সাজন করছে, আমার কাজ আমি। ও খোলস থেকে বেরিয়ে নিজের ভাঁজ খুলে দিয়েছে। আর আমি খোলসমুক্ত একটা শামুকের গল্প তৈরি করছি। ‘তোমার ভাঁজ খুলো আনন্দ দেখাও/ করি প্রেমের তরজমা/ যে বাক্য অন্তরে ধরি/ নাই দারি তার নাই কমা/ তীর্থে তীর্থে বেড়াই ঘুরি/ পন্থে পন্থে বেড়াই ঘুরি/ মনকে বেকা তেরা করি/ মনের মেঘ তো সরে না। স্রেফ বানোয়াট একটা গল্প তৈরি করতে গেলেও মনটা কেমন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে উঠে। আর সত্যিকারের গল্পগুলোর রস নিজের মতো করে নিংড়ে নেয়ার জন্য চেহারা জুড়ে ভীর করে রাজ্যের মেঘ। সম্ভবত এ কারণেই উদাস, ভাবুক এবং কল্পনাবিলাসীদের মনটা মেঘাচ্ছন্নই থাকে। সব সময়ই নয়, যখন মনকে বেকা তেড়া করার প্রয়োজন হয়, তখনি চলে মেঘের জোয়ার। মনের মেঘটাকে সারানোর জন্যই নিশিদলের সবাই এই গানটি গাইলাম। প্রকৃতির কাছে আবেদন জানালাম সমস্ত ভাঁজ খুলে দেয়ার। আবেদন গ্রহণ করল রাতের অন্ধকার, বিরাণ মাঠ, রুপোলি বিল আর কালো মেশানো সবুজ। সবাই নিজেদের উজার করে দিল নিশিদলের কাছে। লাগাম ছেড়ে দিলাম আকাশে- আকাশে বাতাসে/ চল সাথি উড়ে যাই চল ডানা মেলে রে../ ময়নারে ময়নারে যাবো তোর পিছু পিছু ডানা মেলে রে../ আকাশে ভেসে চল/ রুপ কথার দেশে চল/ ঐ দেশে বাঁধবো ঘর/ পার হয়ে তেপান্তর/ সাত সাগর তের নদী পেছনে ফেলে রে... সাতটি সাগর আর তেরোটি নদী পেছনে ফেলতে না পারলেও ছাদে বসে মনে হলো সাত দু’গুনে চৌদ্দটি সাগর এবং তের দু’গুনে ছাব্বিশটি নদী পেছনে রেখে উড়ে চলেছি। সব কিছুই খাপে খাপ। তবে বাতাসটা অতিরিক্ত পরিমাণে বেশি। একদিকে কু ঝিক ঝিক, অন্য দিকে সোঁ সাঁ বাতাস। এ দুটো মিলেই সাপের হিসহিসানি। কোথাও কোলাহল নেই। আর কোলাহল থাকলেও কু ঝিক ঝিক শব্দে চাপা পড়ে গেছে। ঘুমপাড়ানি গ্রাম। গ্রামের বুক চিঁড়ে কেটে গেছে রেল লাইন। দুই পাশে তারার ছটায় রুপোলি জল। কখনো বেয়াড়া বাতাসে উঁচু গাছের হুটপোটানি। আর লাইনের তীর ঘেঁষে সবুজাভ ঝোঁপ, বাড়ি। বুনো ফুলের কড়া গন্ধটা উথাল পাথাল করে দিচ্ছিল। আমাদের বাহন সাপের ওপর ভর করেছে মাতাল গতি। গতির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিষাক্ত বাতাস। শরীরের পশমগুলো দাঁড়িয়ে গেল। ইচ্ছে হলো সামনের স্টেশনেই নেমে যাই। তবে উঠার ঝক্কির কথা মনে করেই নামার চিন্তা মাথা থেকে উধাও করে দিতে হলো। কিন্তু কোথাও না কোথাও গিয়ে তো আমাদের নামতে হবেই, তাছাড়া ট্রেনের গন্তব্যে পৌঁছার আগে মাঝ পথে নামাটা আরো আতঙ্কের ব্যাপার। এ আতঙ্কটা যে কতটা ওজন নিয়ে ঘাড়ে চেপে বসেছে তা কেবল টের পাচ্ছি আমরাই। আমরা বলতে চার নিশাচর। এর বাইরের কেউ নয়। না সাজন, না ছাদে চড়া অন্য কোনো যাত্রী। আর ঘরের ওম নিয়ে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা সাবরিনা সোবহানের পক্ষে তো পরিস্থিতিটা ধারণা করা একেবারেই অসম্ভব। তিনি যদি ধারণা করতে পারতেন, তবে ছাদ থেকে নেমে যাওয়ার জন্য ফোন করে সাইমুম সাদের প্রতি আদেশ জারি করতেন না। কেবল আদেশ করেই ক্ষান্ত হলেন না, বুঝতে পারলাম বেচারা সাদকে বাচ্চা মানুষ পেয়ে রীতিমতো ঝাড়িও মারছেন। অবশ্য নিশিদলের এই ঝাড়িবাজ পর্যবেক্ষকের ঝাড়ি বুলেটগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে মোকাবেলা করার চেষ্টা করি। একটা বুলেটও গায়ে লাগতে দেই না। কোনোটা কান ছুঁই ছুঁই করে পাশ কেটে যায়। আবার কোনোটা সাঁ করে চুল স্পর্শ করে মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। মওকামতো পাল্টা ঝাড়িও ছাড়ি। তবে সাবরিনা সোবহানের এবারের ঝাড়িটা খেয়ে সাদের অবস্থা তথৈবচ, শুনতে পেলাম ফোনের এ পাশ থেকে সে শুধু আপু, আপু করছে। ওপাশে নিশ্চয়ই তুফান। তবে তুফানের গতি একটু কমলেই সুযোগ নিয়ে নিচ্ছে সাদ। বলার চেষ্টা করছে, ছাদে বসে আমাদের ভালোই লাগছে, ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। আমিও প্রথম দিকে এমনটাই বোঝানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিসের বুঝ কিসের কি! তিনি সোজা জানিয়ে দিলেন, এই মুহুর্তে যেন নিশিদল ছাদ থেকে নেমে যায়। ট্রেন তো চলছে বাতাসের বেগে। চলতি ট্রেনে নামবো কি করে? তাহলে সামনের স্টেশনে অবশ্যই নামতে হবে। একটা স্টেশনে বেশি সময় দাঁড়ায় না। এই সময়ের ভেতর নামতে গেলে দুর্ঘটনা ঘটবে। তিনি আমাদের কথা আর শুনতে চাইলেন না। বললেন, ট্রেন কতক্ষণ দাঁড়ায়, না দাঁড়ায় ওসব আমার জানা আছে। আমরা আবারো পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে চাইলাম। এবং আশ্বস্ত করতে চাইলাইম, আমাদের উড়ালপঙ্খীটা যেখানে গিয়ে দীর্ঘ সময় হাঁপাবে, তখনি ছাদ থেকে কেটে পড়বো। মুখে বললাম ঠিক, তবে কাজে কতটা কাটতে পারবো, তা নিয়ে যথেস্ট সন্দেহ রয়েছে। সন্দেহ রয়েছে সাবরিনা সোবহানেরও। তিনি একেবারে মেপে মেপে তিন চা চামচ পরিমাণ সন্দেহ মিশিয়ে বললেন, ওসব আমার জানা আছে। তারপর ফোনটা কেটে গেল। কেটে গেল সন্দেহ ঢালার সব ধরনের সুযোগ। তবে কি কারণে যেনো মনের ভেতর একটা বিটকেলে সন্দেহ উঁকি দিয়েই রইলো। বার বার মনে হতে থাকলো, সাবরিনার সন্দেহের পরিমাণ একটু বেশিই হয়ে গেল। তিন চা চামচের যায়গায় এক চা চামচই যথেষ্ট ছিল। অতিরিক্ত দুই চামচের ভার আমাদের বইতে হতে পারে। অর্থাৎ, অর্থাৎ... কী সেই অর্থাৎ, কোনো অমঙ্গল নয় তো? অবশ্যই অমঙ্গল। ভাবতেই গা টা শিরশির করে উঠলো। সাথে সাথেই স্রোতের মতো ধেয়ে আসা বাতাসগুলোও কাবু করে ফেললো। আমি ঠান্ডায় শক্ত হয়ে যাচ্ছি দেখে ব্যাগ থেকে একটা লুঙ্গি বের করল সাজন। তারপর দু’জনে মিলে ঢুকে পড়লাম ওটার ভেতর। কান, পিঠ, নাক সবই ঢাকা। মনে হলো তীব্র শীতে লেপের ওমের ভেতর আছি। আমাদের এমন সুব্যবস্থা দেখে একটু একটু ইর্ষা হলো তুহিনের, তবে মুখে কিছু বললো না। আরিফ, আর সাদের অবস্থাও খারাপ। এরা একে একে সার ধরে আমার আর সাজনের পেছনে বসলো। এতে বাতাসের স্রোতটা সোজা এসে ধাক্কা খাচ্ছে লুঙ্গি পেঁচানো আমাদের দুই জনের গায়ে। পরে গতিটা একটু কমে ওদেরকে স্পর্শ করছে। এতে ওদেরও কিছুটা সুবিধা হলো। এভাবেই মিল ঝিল করে চললো আমাদের ‘জার্নি বাই স্নেক’। একটা স্টেশনে এসে উড়ালপঙ্খিটা বিরতি নিলো। এই সুযোগে সাইমুম সাদের দামি ক্যামেরাটা ব্যাগ থেকে বের করলাম। ছাদে চললো ফটো সেশন। এর মধ্যে চার নিশাচর এক সাথে ছবি তোলার জন্য সাজনের হাতে ক্যামেরাটা দিয়েছিলাম। সাথে সাথেই দেখলাম, আশ পাশের কামরা থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেশ কয়েকটা লোক জুটে গেল। ওরা ঘিরে দাঁড়ালো সাজনকে। লাফ দেয়ার ভালো একটা যুতও তৈরি করল। আমার কেন জানি মনে হলো, এখনি কেউ একজন ক্যামেরাটা নিয়ে লাফিয়ে নেমে যাবে প্লাটফরমে। একবার পেছন দিকে তাকালাম, না আমাদের সবাই ছবি উল্লাসে ব্যস্ত। আমি মুহুর্তের মধ্যেই বিপরীত কাণ্ড করে বসলাম। সবার উল্লাসের মুখে ছাই দিয়ে সাজনের হাত থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে একেবারে নিজের গলার সাথে ঝুলিয়ে নিলাম। মুখ কালো হয়ে এলো উপস্থিত অভ্যাগতদের। আমিও নিজের চেহারাকে কালো রেখেই ক্যামেরাটাকে ব্যাগবন্দি করে ফেললাম। তারপর ব্যাগটা সযতেœ রাখার আদেশ জারি করলাম সাদের প্রতি। সেই আদেশ বলবৎ রইলো দীর্ঘ সময়। উড়ালপঙ্খিটা আরো একটা স্টেশনে এসে থামলো। ঢাকা থেকে আসা বেশিরভাগ যাত্রীরাই সুর সুর করে নেমে যেতে থাকলো প্লাটফর্মে। বিষাক্ত সাপটার হাঁপানি দেখে মনে হলো, কিছু সময় এখানে হাঁপিয়ে যাবে। তাই নামার চিন্তাটা একবার ভুঁস করে মাথায় চলে এলো। কিন্তু এখানেই যে থামবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। হয়তো দেখা যাবে কেউ নামতে পেরেছি, কেউ পারিনি। আবার নামার সময় সরিসৃপটা পেট ঘঁষতে ঘঁষতে চলতে শুরু করলে বিশ্রী ব্যাপার হয়ে যাবে। সিদ্ধান্ত নিলাম নামবো না। কিন্তু গাড়িটাও স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে না। স্টেশনের নাম গফরগাঁও। দিনের আলোতেই ভয়ঙ্কর, রাতের আাঁধারে পরিণত হয় রহস্য স্টেশনে। এই রহস্য স্টেশন গফরগাঁওয়ের অনেক কাহিনীই শুনেছি হামিদ ভাইয়ের আস্তানায়। হামিদ ভাই বলতে শিল্পী হামিদুল ইসলাম। একটি পরিপাটি আস্তানায় বসে তিনি শিল্পকর্ম করেন। আর করেন আড্ডাকর্ম। দুটোই সমানে সমান। আমাদের সাথে আড্ডায় বসেই তুলি হাতে রঙ তামাশা শুরু করেন। রঙদানি থেকে রঙ নেন। আর রঙের দুনিয়া থেকেও কিছুটা রঙ মাখিয়ে নেন। তারপর ক্যানভাসে আঁচর টানতে থাকেন। তখন তার আনমনা মনও দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। একটি থাকে রঙদানি ও ক্যানভাসের দিকে, অন্যটি আমাদের আড্ডায় অর্থাৎ রঙের দুনিয়ায়। রঙদানি আর রঙের দুনিয়ার রঙ মিলে মিশে ক্যানভাসে যা মূর্ত হয়, তা একেবারেই জীবন্ত। নিশিদলের জীবন্ত লোগোটি তিনিই বানিয়ে দিয়েছিলেন। একটি পূর্ণচন্দ্রকে ঘিরে চার চারটি নিশাচরের কাঠামো। কাছ থেকে দেখলে মায়াবি, দূর থেকে সাদা আর কালোর মিশেলের এই লোগোটাকে গা ছমছমে মনে হয়। একেবারে খাপে খাপ লোগো হয়েছে ওটা। নিশিদল মানেই তো গা ছমছমে। রাতের অন্ধকারে গা ছমছমে যাত্রা করবে, আর যাত্রার খবর শুনে অন্যদেরও গা ছমছম করবে। কেউ চুপ মেরে যাবে, কেউ পাগলামি বন্ধ করার কথা বলবে। তবে অন্য সবার চেয়ে আলাদা ফরিদ ভাই। সাংবাদিক সরদার ফরিদ আহমদ। তিনি বাউন্ডেলে ছিলেন, বাউন্ডেলেদের প্রশ্রয় দেন। নিজের বাউন্ডেলেপনার গল্প বলেন, বাউন্ডেলে নিশিদলকে সামনে বাড়তে বলেন। নিজেও চলেন তরতর করে। যেন কোনো পিছুটান নেই। সত্যি সত্যিই যেকোনো কাজ তার কাছে জলবত তরলঙ। যা করতে পারবেন না, তা নিয়ে মাথা ঘামান না। তবে যা নিয়ে মাথা ঘামান, তা করেই ছাড়েন। ফরিদ ভাইয়ের এই জলবত তরলঙ ছায়াটা নিশিদলের সাথে আছে, তাই নিশিদলও চলছে জলবত তরলঙ গতিতে। বলছিলাম হামিদ ভাইয়ের আস্তানার কথা। ওখানকার নিয়মিত একজন জাকির ভাই। কবি জাকির আবু জাফর। কবিতা লিখেন, তবে সবি সেই জলবত তরলঙ। সব জলবত তরলঙ হলে সেটা কবিতা হয় নাকি! কবিতা হতে হবে পাথরের মতো কঠিন, শিশার মতো নিñিদ্র। কিন্তু জাকির ভাইয়ের কবিতাগুলো জলের মতো তরল- ‘রাত্রির দরোজা খুলে বেরিয়েছে নিভাঁজ আঁধার/পৃথিবীর সব প্রাণ সব প্রেম সকল আরম্ভ/ সমস্ত সমাপ্তি আর মধ্যবর্তী যত আয়োজন/ অন্ধকার থেকে এসে দাঁড়িয়েছে আলোর অস্তিত্বে/ শেষতক আঁধার থেকে কুড়িয়েছি পৃথিবীর মুখ... অন্ধকার থেকেই বেরিয়ে আসে আলোর অস্তিত্ব। আলো জ্বালাতে হলে আঁধারেই জ্বালাতে হয়। আলোর ভেতর আলোর আলাদা অস্তিত্ব নেই। এর জন্য প্রয়োজন অন্ধকার। আর এই অন্ধকারের আলাদা অস্তিত্ব নিয়েই পৃথিবীর মুখ কুড়িয়ে আনতে চাইছে নিশিদল। নিশিদলের গতিবিধির অনেক কিছুই আলোচিত হয় হামিদ ভাইয়ের আস্তানায়। আমাদের এই নিশি নিশি খেলা হামিদ ভাই উপভোগ করলেও দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি একরকম আতঙ্কিত। মাঝে মাঝেই কর্মকাণ্ড সাময়িক স্থগিত রাখার উপদেশ দেন। আর নানান ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর কাহিনীও শুনান। এসব গল্পগুজবের মধ্যে বহুল আলোচিত একটি নাম গফরগাঁও। কারণ ওখানে মুনির ভাই আর মাজহার ভাইয়ের বাড়ি। হামিদ ভাইয়ের আস্তানার এই দুই আড্ডাবাজ একই মায়ের সন্তান। তবে একজন স্থির, অন্যজন অস্থির স্বভাবের। সপ্তাহে অন্তত কয়েকবার ঢাকা থেকে গফরগাঁও, গফরগাঁও থেকে ঢাকা যাতায়াত করেন মাজহার ভাই। তাও রাত বিরাতের ট্রেনে । আর গফরগাঁওয়ের লোকেরা ট্রেনে কখনো টিকেট কাটে না। তাই এদের সাথে ঝামেলা করতেও আসে না কেউ। ঝামেলা করতে গেলেই বিশাল রকমের গণ্ডগোল বেঁধে যাবে। কলার ধরে স্টেশনে নামাতে সময় লাগবে দশ সেকেন্ড। হই হই করে স্টেশন থেকে লোকবল ছুটে আসতে সময় নেবে আরো দশ সেকেন্ড। সবার হাতে থাকবে চ্যালা কাঠ। এরপর সাইজ করার পালা। গফরগাঁও স্টেশনে এমন অসংখ্য সাইজ করার গল্প বলেছেন মাজহার ভাই। কিছু তিনি নিজের চোখে দেখেছেন, কিছু লোকের মুখে শুনেছেন। তবে তিনি পই পই করে সাবধান করেছেন, কখনো গফরগাঁও গেলে যেন সাবধানে থাকি। ওখানকার হকাররাও বিপজ্জনক। ট্রেনটা গফরগাঁও স্টেশনে থামার পরই মাজহার ভাইয়ের কথা মনে পড়লো। তবে তার সাবধান বানিগুলো বেমালুমই ভুলে গেলাম। আমরা অধৈর্য্য হয়ে অপেক্ষা করছি, কখন হুঁইসেল বাজিয়ে আবার চলতে শুরু করবে গাড়িটা। কিন্তু অনেক সময় হয়ে গেল, তবুও চলল না। বেশ কয়েক স্টেশন ধরেই পেটটা কিছু একটা খাই খাই করছিল। কিন্তু ছাদের ওপর বসে থেকে একবার ঝালমুড়ি আর পপ কর্ন ছাড়া বেশি কিছু খেতে পারিনি। ভাবছি বড় রকমের একটা খাওয়ার জন্য অর্থ সম্পাদক তুহিনের ওপর চাপ প্রয়োগ করব। তখনি মুখ খুললো সাইমুম সাদ- পেটে ক্ষিধা লাগছে। আমি সমর্থন জানালাম। তুহিন ও আরিফ নিরব রইলো। তবে অতিরিক্ত রকমের সরব হয়ে উঠলো সাজন। ছাদের ওপর থেকে ঝুঁকে পড়লো নিচের দিকে। অযথাই ডাকাডাকি শুরু করল স্টেশনের লোকদের- এই ভাই এই, আমরারে একটু মুড়ি আইন্না দিতে ফারবা? প্রথমে আবেদন রাখল আট-দশ বছর বয়সি ছেলের কাছে। সে অপারগতা জানাতেই একটা গালিবুলেট ছাড়ল সাজন। এর পর অন্য আরেক পিচ্চিকে। এভাবে কয়েকজনকে অনুরোধ এবং গালাগাল করেও দমছিল না সে। মুড়ি আর চানাচুর খেয়েই ছাড়বে সাজন। অবশেষে আমি এগিয়ে তাকে নিবৃত্ত করলাম। কিন্তু তাতেও একেবারে দমলো না। আমাদের পাশ থেকে উঠে লাফিয়ে পাশের কম্পার্টমেন্টের ছাদে চলে গেল। ফিরে এলো অনেক সময় পর। এসেই জানালো সু খবরটা- ছাদে পিঠাওয়ালা উঠছে। আমি কইয়া আইছি, এম্মে (এদিকে) আইবো। আমি একটু চনমনে হয়ে উঠলাম। দেখলাম, সবাই যেন নড়েচড়ে বসলো। কিন্তু পিঠাওয়ালার খবর নেই। একটু পর দেখতে পেলাম পাশের কামরার ছাদে কয়েকজনকে পিঠা খাওয়াচ্ছে সে, তবে আমাদের দিকে আসছে না। আবারো গালির তুবড়ি ছাড়লো সাজন। সবই কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষার গালি। আঞ্চলিক হোক বা জাতীয়ই হোক, গালি সবসময়ই গালি। এর প্রভাবও ব্যাপক। কিন্তু এই হকারের ওপর গালাগালের কোনো প্রভাব পড়ছে বলে মনে হলো না। সে যতই গালাগাল করছে, হকারটা ওপাশে বসে থাকা কয়েকটা লোকের কুণ্ডলির সাথে ততই মিশে যাচ্ছে। একবার গলা বাড়িয়ে বলেছেও, এদিকে শেষ কইরা নেই। ট্রেন তখনো প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে ধৈর্য্য পরীক্ষা দিচ্ছে। ওদিকে ধৈর্য্য পরীক্ষা দিচ্ছে সাজন ও পিঠাওয়ালা। অনবরত পিঠাওয়ালাকে ডেকেই চলেছে, পিঠাওয়ালাও ওদিকেই পিঠা বিক্রিতে ব্যস্ত। আমিও অধৈর্য্য হয়ে উঠলাম, আরে ধুর, ওখানে তো মাত্র কয়েকটা লোক, ওদের কাছে পিঠা বিক্রি করতে এতো সময় লাগে নাকি? খাওয়ার আশাটা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ সময়ে এসে হাজির হলো পিঠাওয়ালা। খুব তাড়াহুরো, আমাদেরকে পিঠা দিয়েই নেমে যাবে সে। দ্রুত কয়েকটা পিঠা বের করে দিলো ভেতর থেকে। সাথে দিলো সরষে ভর্তা। আহ, এই শীত কাঁপুনে বাতাসের মধ্যে সরষে ভর্তা খেলে শরীরটা গরম হয়ে উঠবে। একটু বেশি ভর্তা চেয়ে নেবো পিঠাওয়ালার কাছ থেকে। কিন্তু সৌভাগ্য আমাকে চাইতে হলো না, এমনিতেই বেশি করে ভর্তা দিয়েছে আমাকে। তাকিয়ে দেখলাম অন্যদেরও তাই। যারপরনাই সন্তুষ্ট হলাম হকারের প্রতি। কিন্তু খুবই অসন্তুষ্ট হলাম সাইমুম সাদের আচরণে। ও বেচারা প্রথম খাই খাই করে চিৎকার করছিল, এখন পিঠা খাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। সাঙ্ঘাতিক বোকামি করছে ছেলেটা। আবার কখন না কখন ভাগ্যে খাবার জুটে, তার নাই ঠিক। একটু পরই পেট চুঁ চুঁ করবে, আবার কিছু একটা খাওয়ার জন্য উতলা হবে সাদ। ওর প্রতি বিরক্তির পর পরই চরম বিরক্ত হলাম আরিফের প্রতি। ইচ্ছে হলো ওকে ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেই। কারণ ও পানির বোতলটা ফেলে দিয়েছে। যাওয়ার সময় পিঠাওয়ালা এই বোতলটা ফ্রি দিয়ে গিয়েছিল আমাদের। আমিও নিজের ভাগের সরষে ভর্তা শেষ করে তুহিনের ভাগ থেকে আরো একটু নিয়ে উদরপুর্তি করেছি। তেষ্টাটা একেবারে জিহ্বায় এসে ঠেকেছে। কিন্তু যেই না বোতলটা চাইতে গেলাম, আরিফ সোজা জানিয়ে দিলো ফেলে দিয়েছে। আমার চেহারাটা ভ’তের মতো হয়ে উঠল। জিজ্ঞেস করলাম কেন? সে জানালো, পানির রঙটা ময়লা। মেজাজ আমার আরো বিগড়ে গেল। একটু পর তো হায় হুতাশ করেও পানি পাবো না। এখন স্রেফ একটু ময়লা বলে আস্ত বোতল ফেলে দিলো! রাগে গজগজ করতে করতে পিঠাওয়ালার চিতল পিঠা খেলাম। সরষে ভর্তাটুকুও চেটেপুটে শেষ করেছি। ট্রেন তখনো দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে। ট্রেনের হাঁপানিতে আমাদের কাছেও কেন যেন ছাদটা বিরক্তিকর হয়ে উঠলো। অনেকটা হঠাৎ করেই সবাই একমত হয়ে গেলাম, নিচে নেমে যাবো। কেন একমত হলাম, তাও ঠিক করে বুঝতে পারলাম না। নিচের দিকে ঝুঁকে এক পিচ্চিকে জিজ্ঞেস করলাম, ভেতরে সিট খালি আছে নাকি? প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে থাকা পিচ্চি চোখ দিয়ে ট্রেনের ভেতরটা জরিপ করে আমাদের জানালো সিট খালি আছে। ব্যস তরতর করে নামার জন্য উদ্যত হলাম সবাই। কিন্তু উদ্যত হলাম যত সহযে, নামাটা তত সহজ নয়। তুহিন তো ঝুঁকি নিতে চায় নি। সাদ থেকেই লাফিয়ে পড়লো প্লাটফরমে। পড়লো তো পড়লোই একেবারে চিতপটাং। পরে জানতে পেয়েছিলাম, তখন নাকি তুহিনের মনে হয়েছিল গোটা দুনিয়াটা কেবল ঘুরছে। সব অন্ধকার। চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলো না। আমি হাঁচড়ে-পাঁচড়ে কোনো রকম নামলাম। এর পর একি রকম ঝক্কি সামলে নামলো সাদ। আমাদের দেখাদেখি নামলো সাজনও। সবার শেষে আরিফ। আমাদের সৌভাগ্য, আরিফের নামা শেষ হওয়ার পরই সিঁটি বাজালো ট্রেন। এরপর ঝিরঝির করে চলতে শুরু করল। একটু আগে এই চলা শুরু হলেই আরিফের নামাটা আটকে যেতো। আমরা দ্রুত ঝিরিঝিরানি ট্রেনের দরজা ধরে একটি কামরার ভেতর চড়ে বসলাম। লক্ষ্য করলাম, তুহিন কামরায় ওঠেই বাম দিকে কোথায় যেন একটা সিটের ব্যবস্থা করে বসে পড়লো। আমরা বাকি তিনজন, একবার সিটের আশায় ডান দিকে কামরাটার শেষ মাথা থেকে ঘুরে এলাম। ওদিকে সুবিধা করতে না পেরে চলে এলাম আবার তুহিনের যায়গায়। দেখলাম বেচারা সিট নিয়ে চুপচাপ বসে আছে। কামরার এই অংশটায় একটা ডিজেল ইঞ্জিন চলছে। ওটা পুরো ট্রেনের বাতিগুলোর চার্জ যোগায়। ইঞ্জিনের কাছাকাছিই দরি দিয়ে অংশটা আটকানো। ভেবে পেলাম না, তুহিন কি করে এই দরি দেয়া অংশটা পাড়ি দিলো। যেহেতু তুহিন পাড়ি দিয়েছে, সেহেতু আমাদেরও দিতে হবে। বহু কষ্টে একে একে এই দরি দেয় অংশটা পার হলাম। ওপাশটায় ট্রেনের সাধারণ সিটের মতো সিট নয়, কেমন যেন এখানে কয়েকটা, ওখানে কয়েকটা এলোমেলো সাজানো। আরিফকে দেখলাম ক্লান্ত। ধুক পুক করে চলতে থাকা ডিজেল ইঞ্জিনটার পাশ ঘেঁষে একেবারে কোনার দিকে সিটের ব্যবস্থা করে নিয়েছে সে। ওদিকে সাদও যেন কোথাও বসতে পেরেছে। আমি তখনো দাঁড়িয়ে। বাম দিকে তাকিয়ে দেখি সাজনও আমাদের সাথেই আছে, একটু ঠেলে ঠুলে বসার যায়গাও করে নিয়েছে। অবশেষে আমিও তুহিনের পাশে যায়গা পেলাম। জায়গা পেলাম এবং বসলাম। তাকিয়ে দেখলাম, সামনের সিটে ছোট্ট একটি মেয়ে শুয়ে আছে। কিছু সময় ঘুমুচ্ছে। আবার এ পাশ ওপাশ করে গড়াগড়ি খাচ্ছে। মাঝে মাঝে চোখ বড় বড় করে আমাদের দেখছে। নানা ধরনের চিন্তা খাবি খাচ্ছে আমার মাথায়। এই মেয়েটা একদিন বড় হবে। ওরও নাতি-নাতনি হবে। তখন হয়তো আজকের এই ট্রেনে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যাত্রার গল্পটা নাতি-নাতনিদের সাথে বলবে সে। হয়তো সে সময়ের ট্রেনগুলো থাকবে অন্যরকম। আগামীর সেই নাতি-নাতনিরা আজকের এমন ট্রেনের কথা ভেবে শিহরিত হবে। আজকের এই মেয়েটা বুড়ি দাদি বা নানি হয়ে বিপুল উৎসাহে এ গল্পগুলো চালিয়ে যাবে। হয়তো তার গল্পে আমরাও ঢুকে যেতে পারি এভাবে- জানিস, জানিস সেই সময় না নিশিদল বলতে একটা দল ছিল। নাতি-নাতনিরা জিজ্ঞেস করবে, তাই নাকি! এই দলটা কি নিশিতে চুরি করতো? আজকের এই মেয়েটা হয়তো বলবে, চুরি করতো কি না জানি না। তবে সেই দিন আমি যখন ঘুমিয়ে ছিলাম, তখন নিশিদল লেখা কালো রঙের গেঞ্জি পরে চারজন লোক উঠেছিল ট্রেনে। এসব আজগুবি ভাবনার কিছুটা তুহিনের সাথে শেয়ার করলাম। তারপর, তারপর কী হলো? তারপর আর কিছুই হলো না। কেবল ডিজেল ইঞ্জিনের ধুকপুকানি। আর এই ধুকপুকানিটাই আমাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। ভাসিয়ে দিল উড়াল জগতে। মনে হলো স্বপ্ন দেখছি। হ্যাঁ, কিছু একটা দেখছি। তবে কি দেখছি? সবই এলোমেলো। স্বপ্নের ভেতর যেমন একটা দৈত্য থাকে, ওটা হেই হেই করতে করতে তেড়ে আসে। একেবারে ছুঁই ছুঁই করেও ছুঁতে পারে না। দৈত্যের ভয়ে কখনো দৌড়ে চলি, কখনো বাতাসে ভেসে, কখনো আকাশে উড়ে। দুই হাতে পাখির মতো ডানা গজায়। কী আরাম। আকাশের নীলের নিচ দিয়ে উড়ে বেড়াই। আবার দৈত্যটাকে খেপানোর জন্য নিচে নেমে আসি। ঘোঁত ঘোঁত করতে করতে ওটা আমাকে ছুঁইয়ে দেয়। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি উড়ালডানা দুটো খসে পড়েছে। তারপর আবার পেছন থেকে সেই দৈত্যের তাড়া, আবার দৌড়। মনে হলো অদ্ভুত এক রুপকথার দেশে চলে গেছি। স্বপ্নের ভেতর যেমন ইচ্ছে করে স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তেমনভাবেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারলাম। মাঝে মাঝে স্বপ্নের ভেতর দ্বিধা দ্বন্দ্বেও পড়তে হয়, ওটা কি স্বপ্ন, না বাস্তব? অনেক সময় স্বপ্নকে বাস্তব মনে হয়। আবার কখনো কখনো স্বপ্নের ভেতরে থেকেও বলে দেয়া যায়, ওটা স্বপ্ন। আর যখন নিশ্চিত হওয়া যায় ওটা স্বপ্ন, তখন কিছু করতে বাঁধা নেই। যা খুশি তাই করো। পাঁচ তলা থেকে ঝাঁপ দিলেও ক্ষতি নেই। কারণ ওটা বাস্তব নয়, স্বপ্ন। আমিও চলে গেলাম সেই যা খুশি তা করোর রাজ্যে। তখন মনে হলো, কোনো কিছুই বাস্তব নয়, সবই স্বপ্ন আর স্বপ্ন। একবার মনে হলো হৈ-হুল্লোড়, একবার সাইমুম সাদের গলার শব্দ, একবার আরিফের গলা। ওদের কথাগুলোই মনে হলো পাখিদের সুরেলা কিচির মিচির। আবার এগুলোই রুপান্তরিত হলো সিংহের গর্জনে। স্বপ্নের দেশে আমি অবাক। হচ্ছেটা কী এসব? কী হচ্ছে বা না হচ্ছে এর কোনো কিছুই বলতে পারব না আমি। বলতে পারেনি তুহিন, আরিফ। তবে পুরোটাই বলতে পেরেছে সাইমুম সাদ। কারণ সে পিঠাওয়ালার সেই চিতল পিঠা আর সরষে ভর্তা খায়নি। ভর্তা না খেলেও খুব সহজে ব্যাপারটা ধরতে পারেনি সে। মিনিট বিশেক পর নাকি পরের স্টেশনে ট্রেনটা থামল। কথা ছিল গফরগাঁওয়ের পরের স্টেশনেই নেমে যাবো। এ কারণেই সাইমুম সাদ আমাদের ডাকল। পাশাপাশি ট্রেনের টিটি এসেও ডাকাডাকি শুরু করল। দুই ডাকাডাকির পর আমরা নাকি স্বপ্নের জগত ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। কিন্তু আমাদের দেখে সাদের মনে হলো অন্য জগতের লোক। দাঁড়িয়ে আছি, তবুও চোখ জুড়ে রাজ্যের ঘুম। তারপরও আমাদেরকে স্বাভাবিক ভাবলো সাদ। সে ততক্ষণে ট্রেন থেকে স্টেশনে নেমে গেছে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলো আমাদের নামার নাম গন্ধ নেই। নিচ থেকে ডাকছে। কিন্তু সারা নেই। ট্রেন ঝির ঝির করে চলতে শুরু করল। গলার জোর বাড়িয়ে দিলো সাদ। এবারো ফলাফল শূন্য। ট্রেনের গতি আরো বাড়ল। বাধ্য হয়ে আবারো ট্রেনে চড়তে হলো সাদকে। উঠার পর ঘটনা তদন্ত করার জন্য আমার দিকে এগিয়ে এলো সে। আমার অবস্থা গুরুতর। হাঁটতে গিয়ে লোকের ওপর উল্টে পড়ছি। মুখ দিয়ে সাদা ফেনা বের হচ্ছে। আমি তখন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। ট্রেন থেকে পড়ে যাওয়ার অবস্থা। তুহিন চুপচাপ। কোনো কথা নেই। হাঁটতে গিয়ে অন্যের সিটে ঢলে পড়ছে। তবে আরিফের অবস্থা কিছুটা ভালো। তিন তিনটা জীবন্ত লাশ দেখে ভড়কে গেল সাদ। বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করল। তখনই মনে হলো সেই পিঠাওয়ালার কথা। একটা কিছু করতে হবে তাকে। নিজের ব্যাগের ভেতর ক্যামেরাটা নিরাপদে আছে কি না দেখলো। তারপর সবার পকেট থেকে মোবাইল ফোনগুলো হাতিয়ে নিলো সাইমুম সাদ। আমাদের ঘিরে অনেক লোকের জটলাও তৈরি হতে চেয়েছিল। কিন্তু সে সুযোগ সন্ধানীদের সুযোগ করে দেয়নি। জামালপুর স্টেশনে ট্রেন থামার পর আমাদের নিয়ে নেমে গেল সাইমুম সাদ। রাত তখন সাড়ে তিনটা। মধ্যরাতে তিনটা অবচেতন মানুষকে নিয়ে কী করবে, কোথায় যাবে দ্বিধায় পড়ে গেল সে। আমাদের এ অবস্থা দেখে সাদের অবস্থাও যায় যায়। সিদ্ধান্ত নিলো, যেভাবেই হোক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে সে। কিন্তু এত রাতে ডাক্তার কোথায় পাবে! মাথাটা ধরে এলো সাদের। তিনজনকে বসিয়ে রেখেছে স্টেশনের মেঝেতে। আমাদের রেখেও যেতে পারছে না। তাছাড়া এক জনের পক্ষে তিনজনকে চোখে চোখে রাখাটা কঠিন। তখনি সাদ লক্ষ্য করল, তার তিন রোগী ঢুলতে ঢুলতে হাঁটতে শুরু করেছে। একেকজনের গন্তব্য একেক দিকে। ওর প্রতি কারো খেয়াল নেই। এমনকি আমরা ওকে চিনতে পারছি কি না, সেটা নিয়েও ও দ্বিধায় পড়ে গেল। আমি তখন হাঁটতে হাঁটতে পড়েও যাচ্ছিলাম। এ অবস্থায় নাকি তিন মাতালের মধ্যে একবার বেশ ভাবও হয়ে গিয়েছিল। একজন পড়ে গেলে অন্য জন এগিয়ে এলো তোলার জন্য। ব্যস, এগিয়ে আসা পর্যন্ত সার। কিন্ত কেউ কাউকে উদ্ধার করার মতো অবস্থায় ছিল না। তিন তিনটি জীবন্ত বোঝার মধ্যে আরিফের অবস্থাই একটু ভালো। তাই দুই মাতালের দায়িত্ব এক মাতাল আরিফের ওপর দিয়ে রিকশা ডাকতে গেল সাদ। এর মধ্যে অবশ্য মাতাল আরিফের নির্দেশে একবার আচার কিনে আনতে বাধ্য হয়েছিল সে। অবশেষে দুই দুটি রিকশা ডেকে এনে, রিকশাওয়ালাদের সহযোগিতায় আমাদের জামালপুর সদর হাসপাতালে নেয়া হলো। তিনজনকে ভর্তি করা হলো। তবে কোনো বিছানা খালি নেই। মেঝেতেই থাকতে হবে। আমি ওসব ঘটনার কিছুই বলতে পারি না। আছি কেবল যা খুশি তা করোর রাজ্যে। যা ইচ্ছে হচ্ছে তাই করছি। কিন্তু কী করেছি, কিছুই মনে নেই। সব ঘটনা সাদের মুখ থেকে শুনে শুনে লিখতে হচ্ছে। একটা কম্বলে গাদাগাদি করে তিনজনকে শুইয়ে দেয়া হলো। এরপর নার্স স্যালাইন লিখে দিল সাইমুম সাদকে। সে বাইরে থেকে তিন তিনটি স্যালাইন কিনে আনলো। এবং রগের সাথে স্যালাইন লাগিয়ে দেয়া হলো। স্যালাইন চললো। প্রথম দিকে আমি একেবারেই জ্ঞানশূন্য। আরিফের কিছুটা জ্ঞান আছে। আর তুহিন আমার আগে জ্ঞান ফিরে পেয়েছে। তবে সকালের দিকে যখন আমি নড়াচড়া করতে শুরু করলাম, তখন থেকে শুরু হলো ফিল্মি আবহ। সাদকে ডেকে বিজ্ঞের মতো জিজ্ঞেস করছিলাম আমি এখানে কেন, কিভাবে? সাদ বার বারই জবাব দিচ্ছিল। তবুও আমি জিজ্ঞেস করছি এবং পরমুহুর্তেই আবার স্থবির হয়ে যাচ্ছি। আমাকে নিয়ে হাসপাতালজুড়ে রসালো একটা পরিবেশ তৈরি হলো। প্রথম দিকে এক সাথে তিন জনকে স্যালাইন দেয়ার মতো ব্যবস্থা না থাকায়, আরিফকে দূরে একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু সেখানে সঙ্গহীন অনুভব করায় সে আবার আমাদের কাছেই চলে এলো। ওর কিছুটা হুঁশ হওয়ার পর হাসপাতালে রোগীদের ভিড়, স্বজনদের কোলাহল, আর আমাদের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে ভীষণ রকম যন্ত্রণা হচ্ছিল। তখনো পূর্ণ জ্ঞান ফেরেনি। সবকিছু আবছা আবছা দেখছিল। কানে শব্দ ঢুকছিল, তবে বুঝতে পারছিল না। আমি ছিলাম সবচেয়ে বেশি বেহুঁশ। আমার হাতে স্যালাইন লাগানোর সময়ও নাকি রগ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। একটু নড়াচড়া শুরু করার পর নিজেই স্যালাইনের গতি বাড়িয়ে দিচ্ছিলাম, আবার কমিয়েও দিচ্ছিলাম। সকালের দিকে সবার জন্য রুটি-কলা নিয়ে এলো সাদ। তবে এগুলো মুখে তুলে খাওয়ার মতো শক্তি ছিল না আমার। কেউ একজন মুখে তুলে দিল। এতে একটু খেয়েই ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছি আমি। শরীরে ঝাঁকুনি দেয়ার পর একটু চোখ মেলে আবার খাওয়া শুরু করলাম। তারপর আবার ঘুম। চিত্তাকর্ষক এ দৃশ্যটা দেখার জন্য হাসপাতালের অনেক রোগীরাও জটলা করেছিল আমার পাশে। কিন্তু তাদের কৌতুহলী দৃষ্টিগুলোক থোরাই কেয়ার করে বেহুঁশ হয়ে ঘুমিয়ে গেলাম আমি। এর পর যখন উঠলাম, তখন ক্যামেরা হাতে রোগীদের ছবি তুলতে শুরু করলাম। এই দৃশ্যটা স্বপ্নের মতো হালকা দোলা দিয়ে যাচ্ছে আমাকে। একটু মনে করার চেষ্টা করলে সত্যি সত্যিই মনে হয় হাসপাতালের মতো কোনো একটা জায়গায় আছি আমি। কিন্তু নিজের কাছেই মনে হচ্ছে ঘটনাটা সত্যি নয়, স্বপ্ন। আমি স্বপ্ন দেখছি। কাজেই স্বপ্নে যা খুশি তাই করা যায়। ইচ্ছে হলো হাসপাতালের রোগীদের কিছু ছবি তুলে রাখা। যতœ করে তুলতে পারলে এগুলো অসাধারণ সংগ্রহ হবে। হোক না সেটা স্বপ্নের সংগ্রহ। তুলতে শুরু করলাম। ক্লিক, ক্লিক, ক্লিক। স্বপ্নের প্রতিটি ক্লিক যে বাস্তবেও ছবি তুলে ফেলছে সেটা বুঝতে পারিনি। বুঝতে পরিনি অনেক কিছুই। আমার ঘুমটা কখনো পরিষ্কারভাবে ভাঙেনি। সেখানকার কোনো স্মৃতিই পরিষ্কারভাবে মাথায় নেই। এমনকি ঢাকায় আসার পর দুই দিন কোনো কিছু পরিষ্কারভাবে বলতে পারি না। ধূয়ার ভেতর যতটুকু আছে, সেই মুহুর্তগুলো দুই তিনটার বেশি হবে না। এর মধ্যে একটা ছবি তোলার মুহুর্ত। তবে জ্ঞান ফেরার পর অনেক কিছুই পরিষ্কারভাবে মনে আছে তুহিনের। ঘুম ভাঙার পর হাতে স্যালাইন লাগানো দেখে চমকে উঠে সে। তখন থেকেই ওর মনে হতে লাগলো হাসপাতালে বেশি সময় থাকা ঠিক হবে না। দ্রুত ঘরে ফিরতে হবে। ছুটে গেল নার্সের কাছে। কিন্তু নার্স অসুস্থ অবস্থায় আমাদের ছাড়তে রাজি নয়। ওদিকে ফেসবুকে নিশিদলের পেজে লাইভ আপটেড চলছিল। সাইমুম সাদ মুহুর্তের খবর মুহুর্তেই পেজে আপ করে দিচ্ছিল। এতে আমাদের এই অবস্থার খবর অনেকের কানেই চলে গেছে। সাইমুম সাদের ফোন তখন ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। একের পর এক ফোন আসছে। এই করতে করতে দুপুর গড়িয়ে এলো। হাসপাতাল থেকে খাবার দেয়া হলো দুই টুকরো করে পাঙ্গাস মাছ, তিন টুকরো আলু আর মাসকলাইয়ের ডাল। বড় গামলায় অল্প কিছু ভাত। এক গামলায় নিয়ে চারজন চার দিক থেকে খাওয়া শুরু করলাম। কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর নাকি আমরা তিন জনের কেউ এই খাবারের কথা স্বীকার করিনি। আমি সাদের সাথে ঠিকমতো কথা বলছি, ও ভাবছে সুস্থ হয়ে গেছি। একটু পর আবার জিজ্ঞেস করছি, এখানে কিভাবে এলাম? এসব তুলনায় আরিফ তাকে যথেষ্ট শান্তিতে রেখেছে। সে অনেক সময় উদাস হয়ে বসে থাকে, তারপর হঠাৎ আবদার করে-বাসায় চলে যাবো। অন্য দিকে তুহিন তার অফিসের বসের ভিজিটিং কার্ড খুঁজতে ব্যস্ত। আধা ঘণ্টা তন্ন তন্ন করে খুঁজে আবার ঘুমিয়ে গেল সে। শেষে কার্ডটা তার পকেট থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে। আর তুহিনের মানিব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে আমার পকেট থেকে। এটা কী করে ঘটলো আমার জানা নেই। আবার কখন উদ্ধার করা হলো সেটাও মনে নেই। তবে ধারণা হচ্ছে, কেউ আমাকে চোর প্রমাণ করার জন্য এমন ষড়যন্ত্র করে থাকতে পারে। দুপুরের পর আমাদেরকে উদ্ধার করতে একজন এলেন। তিনি আব্বার সহকর্মী। বাড়ি জামালপুরে, তখন বাড়িতেই ছিলেন। আব্বার ফোন পেয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন। আমাদেরকে মাতাল অবস্থায়ই পেলেন। হাসপাতালের নার্সরা পুরোপুরি সুস্থ না করে ছাড়তে চাইছিলেন না। আরো এক দিন থেকে যেতে হবে। কিন্তু আরিফ আর তুহিনের অস্থিরতায় পালিয়ে চলে আসার পরামর্শ দিলেন। অবশেষে আব্বার সেই কলিগের সহযোগিতায় আমরা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলাম। বেরুলাম ঠিক, আমি তখনো স্ব জ্ঞানে নেই। হাঁটছি, কথা বলছি। হোটেলে বসে খাচ্ছি। তারপরও কিছু বলতে পারছি না। ভদ্রলোক আমাদের হোটেলে নিয়ে ভর পেট খাওয়ালেন। মিষ্টির দোকানে নিয়ে মিষ্টিও খাওয়ালেন। তারপর সবাইকে বাসে তুলে দিয়ে নিজেও ঢাকায় আসতে চাইলেন। কিন্তু সাইমুম সাদ আর আরিফ জানালো, এরা দুইজনই আমাদের দায়িত্ব নেয়ার জন্য যথেষ্ট। অবশেষে পুরো দায়িত্ব নিয়ে এরা আমাদের ঢাকায় নিয়ে এলো। দুই দিন পর পূর্ণ জ্ঞান ফিরে এলো। মাথার ঝিম ঝিম থাকলো আরো সাত দিন। এর পর নিজের মস্তিষ্ককে আগের অবস্থায় ফিরে পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করলাম। কারণ অজ্ঞান পার্টির খপ্পড়ে পড়ে অনেক লোকেরই মারা যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে। সে তুলনায় আমার ক্ষয়-ক্ষতি তেমন কিছুই হয় নি। শুধু ঢাকা ফিরে আসার দুই দিন পর বাম পায়ের নিচের দিকটায় মাঝারি আকারের একটা জখম আবিষ্কার করলাম। কিভাবে হলো জখমটা? তুহিন জানালো জামালপুরে দুপুরের খাবারের পর মিষ্টির দোকানে যাচ্ছিলাম আমরা। এর জন্য রাস্তা ছেড়ে ফুটপাতে উঠতে হবে। সামান্য উঁচু যায়গা। পা টা একটু উঁচু করে দিলেই হয়ে যায়। কিন্তু এতটুকু উচ্চতায় উঠতেও ব্যর্থ হলাম আমি। হুমড়ি খেয়ে সোজা পড়ে গেলাম রাস্তায়। পাশেই নির্বিকার দাঁড়িয়ে থেকে আমার পতন দেখছিল তুহিন। সামান্য ভদ্রতা দেখানোর জন্যও এগিয়ে আসেনি সে।
Wednesday, November 12, 2014
মধ্যরাতের উড়াল কাহিনী :Time News
তা টেনে ধরে। দলের প্রতিষ্ঠার সময়ের আরেক নিশাচর মফিজুর রহমান রোমন। তারও পিছুটান ছিল না। তবে বিয়ে করার পর একটা বিয়েটান তৈরি হয়েছে। তারপরও আমরা তিনজন ছিলাম রাতপাগল। ঝুঁকি নেয়ার আহ্লাদ করে বেরিয়ে যেতাম রাতের অন্ধকারে। অনেক ঝুঁকির আহ্লাদই পুরণ হয়েছে আমাদের। তবে মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে ভেতরটা উঁকি দেয়ার সৌভাগ্য হলো না রোমনের। অবশ্য রোমন এটাকে সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য বলবে, সেটাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এর আগের বেশ কয়েকটা ট্রিপের মতো ১৬তম ট্রিপেও আমাদের সাথে রোমন ছিল না। দিনটা ছিল ২২ অক্টোবর (২০১৪)। বিকেল পাঁচটা। নিশাচর জাফর হায়দার তুহিন, সাইমুম সাদ এবং আরিফ সরকারসহ চার নিশাচর হাজির হলাম কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে। গন্তব্য অজানায়। ট্রেনে উঠবো, যেখানে ইচ্ছে হয়, সেখানেই নেমে যাবো। কিন্তু আমাদের ইচ্ছে হওয়ার আগেই অন্য একটি ইচ্ছে এসে চেপে বসলো। সেটা ভাগ্যের ইচ্ছে। এই ভাগ্যের ইচ্ছেটা কর্পুরের মতো উড়িয়ে নিয়ে গেল আমাদের অতীত এবং বর্তমানকে। এর জন্য কে দায়ী? আমি, তুহিন, আরিফ, নাকি সাদ? ঘটনার পূর্ণ বিবরণ জানার পর অবশ্যই প্রথম তিনজনকে দায়ী করা যাবে না। তবে সাদের দিকে সন্দেহের আঙুল কিছুটা হলেও উঠতে পারে। যদিও আমাদের উড়াল ডানাগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছিল সাইমুম সাদ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের মতো তার দুই পাশেও ডানা গজালো না কেন? তাহলে কি সেই উড়াল কারিগরদের সাথে যোগসাজশ ছিল সাইমুম সাদের? সেটা যদি থেকেই থাকে, তবে আমাদেরকে মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরিয়ে আনার কথা নয় তার। একটার পর একটা প্রশ্ন এসে জট পাকাচ্ছে নিশাচরদের মাথায়। তবে কোনোটারই কিনারা করা যাচ্ছে না। সন্দেহ হচ্ছে সেই রুমার প্রেমে ছ্যাঁকা খাওয়া রহস্যমানব সাজনকেও। সবই রহস্য। উড়ালবাহনে ওঠার পর রহস্যজনকভাবেই সাজনের সাথে পরিচয়। উড়াল বাহন মানে বিমান নয়। সেদিনের জন্য কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি ট্রেনই ছিল নিশিদলের উড়ালবাহন। কারণ আমরা জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জগামী এ ট্রেনটির ছাদে চড়ে বসেছিলাম। যাত্রা করেছিলাম উড়তে উড়তে। ছাদে ওঠার পেছনের কাহিনীটাও রোমাঞ্চকর। সেই বিকেল পাঁচটা থেকে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা। যেকোনো ট্রেনে উঠতে পারলেই হলো। কিন্তু ট্রেন আসছে যাচ্ছে কোনোটাতেই সিট খালি নেই। আবার দিনটি বুধবার হওয়ায় ট্রেনের সংখ্যাও কম। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। হুঁইসেল বাজিয়ে কমলাপুর স্টেশনে এসে ভিরছে একেকটি ট্রেন। কিন্তু মানবজট ঠেলে উঠতে পারছি না। আবার কোনোটা হাঁপাতে হাঁপাতে স্টেশনে আসছে। আমরা আশা নিয়ে এগিয়ে যাই। অতঃপর হতাশ হই। অধিকাংশ ট্রেনই ফিরতি যাত্রা করবে না। কিন্তু আমাদের তো এখানে বসে থাকলে চলবে না। তাই নতুন নতুন প্রেনের খোঁজ করতে শুরু করলাম। সময় গড়াচ্ছে, আমাদেরও ট্রেনে ওঠা হচ্ছে না। হঠাৎ দেখলাম খুলনাগামী ট্রেন চিত্রা একপ্রেসের ইঞ্জিন চালু হয়েছে। আমরা প্রতিটি কামরার দরজায় ছুটাছুটি করে ওঠার চেষ্টা করলাম, পারলাম না। ব্যর্থ হয়ে এগিয়ে গেলাম ইঞ্জিনের দিকে। ওটার দুই পাশে একটু যায়গা অতিরিক্ত থাকে। সেখানে ওঠে বসা যেতে পারে, প্রস্তাব দিলো তুহিন। এই লম্বামতো যায়গাটার পাশে নিরাপত্তার জন্য একটি রেলিংও রয়েছে, বোঝানোর চেষ্টা করল সাদ। কিন্তু ইঞ্জিনের ধুকপুকানির ভয়ে আমার ভেতরটায়ও ধুকপুক শুরু হলো। তা ছাড়া ওখানে ওঠে বসলে ইঞ্জিনের গরমটাও এক সময় অসহ্য লাগতে পারে, বললো আরিফ। উঠবো কি উঠবো না করতে করতে শেষবারের মতো হুঁইসাল বাজালো চিত্রা এক্সপ্রেস। এরপরই কেঁচোর গতিতে চলতে শুরু করল। আমরা আবারো হতাশ হয়ে বিপরীত দিকে ঘুরলাম। তবে কী কারণে যেনো একবার পেছন দিতে তাকালাম। অবিশ্বাস্য কাণ্ড, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কোত্থেকে যেনো উড়ে এলো একটা মানব স্রোতে। মুহুর্তেই মৌচাকের মতো ঘিরে ধরলো চিত্রা এক্সপ্রেসের মস্তকটাকে। আমাদের মস্তকে কিছুই খেলছিল না। কি করবো ভেবেও পাচ্ছিলাম না। ভাবতে ভাবতে যখন হতাশ, ঠিক তখনি গমগম করে উঠলো স্টেশনের সাউন্ডবক্স। ভেসে এলো ঘোষক মহিলার গলা। তিনি জানালেন, এক নাম্বার প্লাটফরমে দেওয়ানগঞ্জগামী একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওটা ছেড়ে যাবে। কালো পোশাক পরিহিত নিশিদলের চার নিশাচর দৌড়ে গেলাম এক নাম্বার প্লাটফরমে। দেখলাম ওটার ইঞ্জিন চালু হয়েছে। তিন-চারটা মাত্র কামড়া। তার ওপর ওগুলো আগেই দখল করে রেখেছে নিয়মিত যাত্রীরা। একটার ভেতরে উঠলাম। পা ফেলার যায়গা পেলাম বটে, তবে মনে হলো ট্রেন ছাড়ার পর পা দুটো নাড়াচাড়া করার সুযোগ হবে না। বিষিয়ে উঠলো মন। তবে আমার চেয়েও বেশি বিরক্তি দেখালো আরিফ। অবশেষে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম ছাদে চড়বো। কিন্তু চড়বো কিভাবে? তাকালাম ছাদটার দিকে। মনে হলো পাহাড়ের মতো উঁচু। তবে লোকগুলোকে দেখলাম কেমন তরতর করে উঠে যাচ্ছে। সহস এলো কিছুটা। সবার আগে এগিয়ে গেল পিছুটানহীন তুহিন। দরজার হাতলের ওপর কোনোরকম পা দুটো ঠেকিয়ে ওখানেই আটকে গেল সে। নিচ থেকে আমরা যে সাহায্য করবো সে উপায়ও নেই। ভাগ্য ভালো ছিল ছাদের ওপর কোত্থেকে যেন এক ভদ্রলোক এসে তুহিনের হাতটাকে টেনে ধরলো। ব্যস, সহজেই ওঠে গেল সে। এরপর ওঠার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হলো আমাকে। কারণ ঝুঁকিপূর্ণ ওঠানামার ব্যাপারে আমার আনাড়িপনা সম্পর্কে ওদের ধারণা আছে। তাই আমি উঠতে পারলে ওদের ভেতরও একটা আত্মবিশ্বাসের তৈরি হয়। বীরদর্পে এগিয়ে গেলাম আমি। প্রথমে পা রাখলাম ট্রেনের পা দানিতে। ঘামে ভেজা হাত দুটো দিয়ে আঁকড়ে ধরলাম হাতল দুটো। কিন্তু বার বারই মনে হলো পিছলে যাচ্ছি। পেছন থেকে সাহস যোগালো সাইমুম সাদ। আরিফ এসে নিচ থেকে ঠেলে ধরলো আমাকে। কিন্তু আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়)। আরিফ যতই ঠেলছে, আমি ততই ঘাবড়ে যাচ্ছি। ওদিকে ওপর থেকে আমার উদ্দেশে হাত বাড়িয়ে আছেন সেই ভদ্রলোক এবং তুহিন। কিন্তু তখনো ওদের হাতের নাগাল পাওয়ার মতো অবস্থায় আসতে পারিনি। দুই দিক থেকেই অপমানজনক বাক্য ছুটে আসছিল। এ অপমান সহ্য করা যায় না। সাহস করে বাম পাটা তুলে দিলাম আরো একটু ওপরে। সাথে সাথেই ওরুর রগে টান লেগে গেল। আমি তখন ফ্রিজ হওয়ার অবস্থা। ঢালু ছাদটার নিচের দিকে কার্ণিশের মতো একটা কিছু ধরতে পারলাম। একদিকে হাতের ওপর ভর করে ওপরে উঠার চেষ্টা করছি, অন্যদিকে তুলে দেয়া পা দুটোর ওপরও ভর দেয়ার চেষ্টা আছে। কিন্তু দুই রকমের চেষ্টাই বিফল। রগের টান বেড়ে বাম পা টা আরো টনটনে হয়ে উঠলো। এ তথৈবচ অবস্থা দেখে সহ্য হলো না তুহিনের। এগিয়ে এসে আমার হাতটা টেনে ধরতে চাইলো। কিন্তু তুহিনের ওপরও আস্থা হলো না সেই ভদ্রলোকের। তিনি তুহিনকে বায়ে রেখে শক্ত করে আমার হাতটাকে ধরলেন। অন্য দিকে আমার আস্থার মাত্রাটাও শূন্যের কাছাকাছি। কারণ ভদ্রলোকের হাতের তালু শুকনো থাকলেও এতক্ষণের কাণ্ডে আমার কব্জি ঘেমে গেছে। তাই শুরু হলো পিছলাপিছলি। আমি পুরো শরীরটাকে ছাদের সাথে এলিয়ে দিলাম। এরপর একটা ভারি বস্তাকে যেভাবে টেনে তোলো হয়, সেভাবেই আমাকে তুললেন ভদ্রলোক। এবার আমার দেখার পালা। কিন্তু লিকলিকে সাইমুম সাদ আমাকে হতাশ করে দিয়ে ভদ্রলোকের হাতের এক হ্যাঁচকা টানেই উঠে গেল। তবে আমার অপমানটাকে কিছুটা হলেও ঢেকে দিল আরিফ। তাকেও সবাই মিলে একরকম বস্তার মতোই টেনে তুললাম। আমরা উদ্ধার হলাম বটে। তবে সেই উদ্ধারকারীকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের ওপর বর্তে গেল অন্য একজনকে উদ্ধারের কাজ। সেই অন্য একজনের নামই সাজন। প্লাটফর্ম থেকে টেনে তুলার পর আমাদের গা ঘেঁষেই বসলো সাজন। চলতে শুরু করল ট্রেন। উড়াল দিলাম আমরা। ঝির ঝির করে বাতাসটা বিপরীত দিকে ঠেলতে শুরু করল। প্লাটফরম ছাড়িয়ে খিলগাঁও রেলগেট, এরপর মগবাজার রেলগেট পেরিয়ে অন্যরকম একটা গতি পেলো উড়ালবাহন। সেই গতিটা আরো বাড়ল এয়ারপোর্ট স্টেশন ছাড়িয়ে। আর টঙ্গি ছেড়ে যাওয়ার পর একেবারেই অন্যরকম। বলা যায় উড়ালপঙ্খী। ঝিক ঝিক শব্দটা আমাদের কানে এসে ঠেকল বিষাক্ত সাপের হিসহিসের মতো। নিশিদল উড়ছে সাপের পিঠে চড়ে। হু হু বাতাস। প্লাটফরম থেকে ছেড়ে যাওয়ার পর কিছু সময় হইচই করে কাটালেও হঠাৎ করেই নিশিদলের ওপর বিষন্নতা ভর করল। বিষন্ন নিশিদলকে উড়াল জগতে নিয়ে গেল বাতাস। আমাদের চেয়েও বেশি উড়ল সাজন। কিছুদিন হলো ওর প্রেমিকা রুমার বিয়ে হয়ে গেছে অন্য এক ছেলের সাথে। রুমা ছাড়া সাজন একেবারেই অসহায়। গান ধরলো সে- আমি সাজন মইরা যামু রুমা হারা হইয়ারে / ভ্রমর কইয়ো, কইয়ো গিয়া... সাজন এখন ২৪ ঘণ্টাই নেশার ওপর থাকে। একটু আগে কলকি টেনে এসেছে। আশপাশের অনেকেই টানছে। একদিকে বিষাক্ত সাপের হিসহিসানি। অন্য দিকে কলকির কড়া ঘ্রাণ। সব মিলিয়ে আমরা হয়ে গেলাম ভাবুক নিশাচর। ভাবছি এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে। ভাবছি সাজনকে নিয়ে। ওর বাড়ি কিশোরগঞ্জের মজলিশপুরে। একেবারে আমার বাড়ির কাছাকাছি। কিন্তু বাড়ির পরিচয়টা গোপন করে গেলাম। হয়তো আমার বাবা চাচাদের চিনেও ফেলতে পারে। সাজন আমাকে চিনে ফেললে সমস্যার কী আছে? সমস্যার তেমন কিছু নেই। তবে পরিচয়টা পেলে হয়তো খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসবে না সে। আর খোলসের ভেতর বন্দী শামুককে নিয়ে কোনো গল্পই হয় না। সাজন বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে কিছুদিন হলো। ওর ভীষণ অস্থিরতা। মেয়ে জাতের প্রতি তীব্র ঘৃণা। ওরা কথা দিয়ে কথা রাখে না। একজনের সাথে প্রেম করে দিব্যি অন্যজনের হাত ধরে চলে যায়। সাজনকে ছেড়ে চলে গেল রুমা। তাই সে গান ধরলো, চলে গেছো তাতে কি / নতুন একটা পেয়েছি / তোমার চেয়ে অনেক সুন্দরী... হ্যাঁ, আজ সে নতুন একজনের সাথেই দেখা করে এলো নারায়ণগঞ্জ থেকে। তবে নতুন জনের প্রতি কোনো মোহ নেই। ইচ্ছে হলো দেখা করল, এই আরকি। সাজনের চেহারা নমুনাও উন্নত। গায়ের রঙ ফর্সা। খাড়া নাসিকা। পুরুষালি আবেদনময়ী চোখ। গায়ে তার ফুলহাতা শার্ট। বুকের বোতাম খোলা। পরনে জিন্স। তাই নিজেকে নিয়ে গর্ব করতেই পারে সে। সাজন বললো, আমি চাইলে যে কোনো ইস্টিশনে নাইম্যা একটা মাইয়া পটায়া লইয়া আইতারাম। আমি চুপ রইলাম। কিন্তু এতে সন্তুষ্ট হলো না সে। বললো, কি বড় ভাই, আমার কতা বিশ্বাস করলাইন না? সাজনের সব কথাই বিশ্বাস হচ্ছিল আমার। সে মিথ্যে বলছে না। রুমা হারা সাজনের জন্য খুব মায়া হলো। ভাবলাম, রুপকথার দৈত্যকে ডাক দিয়ে বলি, রুমাকে সাজনের কাছে এনে দিতে। কিন্তু সেই ইচ্ছেটাও বাতিল করতে হলো একটা স্টেশনে যাওয়ার পর। কেন, কী ঘটলো সেখানে? তেমন কিছুই না। স্রেফ একটু ইভ টিজিং। ট্রেনটা ঝির ঝির করতে করতে প্লাটফরমে স্থির হলো। নিচে কিলবিল করছে যাত্রীরা। হঠাৎ দেখলাম আমার পাশ থেকে উঠে গেল সাজন। ঝুঁকে তাকালো প্লাটফরমের নিচে। আমাকে ইশারা করে একটা কিছু দেখাতে চাইলো। তাকিয়ে আহামরি কিছু দেখলাম না- সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে আছেন দুইজন। একজন ছেলে, অন্যজন মেয়ে। দেখে যথেষ্ট ভদ্রই মনে হলো। কিন্তু সাজন ওদের প্রতি এমন কৌতুহলী হয়ে উঠল কেন? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু তার আগেই জবাবটা পেয়ে গেলাম। একটা অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি দেখিয়ে সে চিৎকার করে উঠলো, হাই ...ক্সি। ওইখানে একজনের লগে বইসা কি করো? ছাদে উইঠা আইয়ো। আমার আরো চাইর বড় ভাই আছে। সেই থেকে শুরু। এর পর যেখানেই কোনো মেয়ে দেখছে বাজে মন্তব্য করছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিব্রত হচ্ছে সাইমুম সাদ। আরিফ, আর তুহিনেরও খুব একটা পছন্দ হচ্ছে না সাজনকে। আমার পছন্দ বা অপছন্দে কিছুই আসে যায় না । সাজনের কাজ সাজন করছে, আমার কাজ আমি। ও খোলস থেকে বেরিয়ে নিজের ভাঁজ খুলে দিয়েছে। আর আমি খোলসমুক্ত একটা শামুকের গল্প তৈরি করছি। ‘তোমার ভাঁজ খুলো আনন্দ দেখাও/ করি প্রেমের তরজমা/ যে বাক্য অন্তরে ধরি/ নাই দারি তার নাই কমা/ তীর্থে তীর্থে বেড়াই ঘুরি/ পন্থে পন্থে বেড়াই ঘুরি/ মনকে বেকা তেরা করি/ মনের মেঘ তো সরে না। স্রেফ বানোয়াট একটা গল্প তৈরি করতে গেলেও মনটা কেমন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে উঠে। আর সত্যিকারের গল্পগুলোর রস নিজের মতো করে নিংড়ে নেয়ার জন্য চেহারা জুড়ে ভীর করে রাজ্যের মেঘ। সম্ভবত এ কারণেই উদাস, ভাবুক এবং কল্পনাবিলাসীদের মনটা মেঘাচ্ছন্নই থাকে। সব সময়ই নয়, যখন মনকে বেকা তেড়া করার প্রয়োজন হয়, তখনি চলে মেঘের জোয়ার। মনের মেঘটাকে সারানোর জন্যই নিশিদলের সবাই এই গানটি গাইলাম। প্রকৃতির কাছে আবেদন জানালাম সমস্ত ভাঁজ খুলে দেয়ার। আবেদন গ্রহণ করল রাতের অন্ধকার, বিরাণ মাঠ, রুপোলি বিল আর কালো মেশানো সবুজ। সবাই নিজেদের উজার করে দিল নিশিদলের কাছে। লাগাম ছেড়ে দিলাম আকাশে- আকাশে বাতাসে/ চল সাথি উড়ে যাই চল ডানা মেলে রে../ ময়নারে ময়নারে যাবো তোর পিছু পিছু ডানা মেলে রে../ আকাশে ভেসে চল/ রুপ কথার দেশে চল/ ঐ দেশে বাঁধবো ঘর/ পার হয়ে তেপান্তর/ সাত সাগর তের নদী পেছনে ফেলে রে... সাতটি সাগর আর তেরোটি নদী পেছনে ফেলতে না পারলেও ছাদে বসে মনে হলো সাত দু’গুনে চৌদ্দটি সাগর এবং তের দু’গুনে ছাব্বিশটি নদী পেছনে রেখে উড়ে চলেছি। সব কিছুই খাপে খাপ। তবে বাতাসটা অতিরিক্ত পরিমাণে বেশি। একদিকে কু ঝিক ঝিক, অন্য দিকে সোঁ সাঁ বাতাস। এ দুটো মিলেই সাপের হিসহিসানি। কোথাও কোলাহল নেই। আর কোলাহল থাকলেও কু ঝিক ঝিক শব্দে চাপা পড়ে গেছে। ঘুমপাড়ানি গ্রাম। গ্রামের বুক চিঁড়ে কেটে গেছে রেল লাইন। দুই পাশে তারার ছটায় রুপোলি জল। কখনো বেয়াড়া বাতাসে উঁচু গাছের হুটপোটানি। আর লাইনের তীর ঘেঁষে সবুজাভ ঝোঁপ, বাড়ি। বুনো ফুলের কড়া গন্ধটা উথাল পাথাল করে দিচ্ছিল। আমাদের বাহন সাপের ওপর ভর করেছে মাতাল গতি। গতির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিষাক্ত বাতাস। শরীরের পশমগুলো দাঁড়িয়ে গেল। ইচ্ছে হলো সামনের স্টেশনেই নেমে যাই। তবে উঠার ঝক্কির কথা মনে করেই নামার চিন্তা মাথা থেকে উধাও করে দিতে হলো। কিন্তু কোথাও না কোথাও গিয়ে তো আমাদের নামতে হবেই, তাছাড়া ট্রেনের গন্তব্যে পৌঁছার আগে মাঝ পথে নামাটা আরো আতঙ্কের ব্যাপার। এ আতঙ্কটা যে কতটা ওজন নিয়ে ঘাড়ে চেপে বসেছে তা কেবল টের পাচ্ছি আমরাই। আমরা বলতে চার নিশাচর। এর বাইরের কেউ নয়। না সাজন, না ছাদে চড়া অন্য কোনো যাত্রী। আর ঘরের ওম নিয়ে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা সাবরিনা সোবহানের পক্ষে তো পরিস্থিতিটা ধারণা করা একেবারেই অসম্ভব। তিনি যদি ধারণা করতে পারতেন, তবে ছাদ থেকে নেমে যাওয়ার জন্য ফোন করে সাইমুম সাদের প্রতি আদেশ জারি করতেন না। কেবল আদেশ করেই ক্ষান্ত হলেন না, বুঝতে পারলাম বেচারা সাদকে বাচ্চা মানুষ পেয়ে রীতিমতো ঝাড়িও মারছেন। অবশ্য নিশিদলের এই ঝাড়িবাজ পর্যবেক্ষকের ঝাড়ি বুলেটগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে মোকাবেলা করার চেষ্টা করি। একটা বুলেটও গায়ে লাগতে দেই না। কোনোটা কান ছুঁই ছুঁই করে পাশ কেটে যায়। আবার কোনোটা সাঁ করে চুল স্পর্শ করে মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। মওকামতো পাল্টা ঝাড়িও ছাড়ি। তবে সাবরিনা সোবহানের এবারের ঝাড়িটা খেয়ে সাদের অবস্থা তথৈবচ, শুনতে পেলাম ফোনের এ পাশ থেকে সে শুধু আপু, আপু করছে। ওপাশে নিশ্চয়ই তুফান। তবে তুফানের গতি একটু কমলেই সুযোগ নিয়ে নিচ্ছে সাদ। বলার চেষ্টা করছে, ছাদে বসে আমাদের ভালোই লাগছে, ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। আমিও প্রথম দিকে এমনটাই বোঝানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিসের বুঝ কিসের কি! তিনি সোজা জানিয়ে দিলেন, এই মুহুর্তে যেন নিশিদল ছাদ থেকে নেমে যায়। ট্রেন তো চলছে বাতাসের বেগে। চলতি ট্রেনে নামবো কি করে? তাহলে সামনের স্টেশনে অবশ্যই নামতে হবে। একটা স্টেশনে বেশি সময় দাঁড়ায় না। এই সময়ের ভেতর নামতে গেলে দুর্ঘটনা ঘটবে। তিনি আমাদের কথা আর শুনতে চাইলেন না। বললেন, ট্রেন কতক্ষণ দাঁড়ায়, না দাঁড়ায় ওসব আমার জানা আছে। আমরা আবারো পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে চাইলাম। এবং আশ্বস্ত করতে চাইলাইম, আমাদের উড়ালপঙ্খীটা যেখানে গিয়ে দীর্ঘ সময় হাঁপাবে, তখনি ছাদ থেকে কেটে পড়বো। মুখে বললাম ঠিক, তবে কাজে কতটা কাটতে পারবো, তা নিয়ে যথেস্ট সন্দেহ রয়েছে। সন্দেহ রয়েছে সাবরিনা সোবহানেরও। তিনি একেবারে মেপে মেপে তিন চা চামচ পরিমাণ সন্দেহ মিশিয়ে বললেন, ওসব আমার জানা আছে। তারপর ফোনটা কেটে গেল। কেটে গেল সন্দেহ ঢালার সব ধরনের সুযোগ। তবে কি কারণে যেনো মনের ভেতর একটা বিটকেলে সন্দেহ উঁকি দিয়েই রইলো। বার বার মনে হতে থাকলো, সাবরিনার সন্দেহের পরিমাণ একটু বেশিই হয়ে গেল। তিন চা চামচের যায়গায় এক চা চামচই যথেষ্ট ছিল। অতিরিক্ত দুই চামচের ভার আমাদের বইতে হতে পারে। অর্থাৎ, অর্থাৎ... কী সেই অর্থাৎ, কোনো অমঙ্গল নয় তো? অবশ্যই অমঙ্গল। ভাবতেই গা টা শিরশির করে উঠলো। সাথে সাথেই স্রোতের মতো ধেয়ে আসা বাতাসগুলোও কাবু করে ফেললো। আমি ঠান্ডায় শক্ত হয়ে যাচ্ছি দেখে ব্যাগ থেকে একটা লুঙ্গি বের করল সাজন। তারপর দু’জনে মিলে ঢুকে পড়লাম ওটার ভেতর। কান, পিঠ, নাক সবই ঢাকা। মনে হলো তীব্র শীতে লেপের ওমের ভেতর আছি। আমাদের এমন সুব্যবস্থা দেখে একটু একটু ইর্ষা হলো তুহিনের, তবে মুখে কিছু বললো না। আরিফ, আর সাদের অবস্থাও খারাপ। এরা একে একে সার ধরে আমার আর সাজনের পেছনে বসলো। এতে বাতাসের স্রোতটা সোজা এসে ধাক্কা খাচ্ছে লুঙ্গি পেঁচানো আমাদের দুই জনের গায়ে। পরে গতিটা একটু কমে ওদেরকে স্পর্শ করছে। এতে ওদেরও কিছুটা সুবিধা হলো। এভাবেই মিল ঝিল করে চললো আমাদের ‘জার্নি বাই স্নেক’। একটা স্টেশনে এসে উড়ালপঙ্খিটা বিরতি নিলো। এই সুযোগে সাইমুম সাদের দামি ক্যামেরাটা ব্যাগ থেকে বের করলাম। ছাদে চললো ফটো সেশন। এর মধ্যে চার নিশাচর এক সাথে ছবি তোলার জন্য সাজনের হাতে ক্যামেরাটা দিয়েছিলাম। সাথে সাথেই দেখলাম, আশ পাশের কামরা থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেশ কয়েকটা লোক জুটে গেল। ওরা ঘিরে দাঁড়ালো সাজনকে। লাফ দেয়ার ভালো একটা যুতও তৈরি করল। আমার কেন জানি মনে হলো, এখনি কেউ একজন ক্যামেরাটা নিয়ে লাফিয়ে নেমে যাবে প্লাটফরমে। একবার পেছন দিকে তাকালাম, না আমাদের সবাই ছবি উল্লাসে ব্যস্ত। আমি মুহুর্তের মধ্যেই বিপরীত কাণ্ড করে বসলাম। সবার উল্লাসের মুখে ছাই দিয়ে সাজনের হাত থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে একেবারে নিজের গলার সাথে ঝুলিয়ে নিলাম। মুখ কালো হয়ে এলো উপস্থিত অভ্যাগতদের। আমিও নিজের চেহারাকে কালো রেখেই ক্যামেরাটাকে ব্যাগবন্দি করে ফেললাম। তারপর ব্যাগটা সযতেœ রাখার আদেশ জারি করলাম সাদের প্রতি। সেই আদেশ বলবৎ রইলো দীর্ঘ সময়। উড়ালপঙ্খিটা আরো একটা স্টেশনে এসে থামলো। ঢাকা থেকে আসা বেশিরভাগ যাত্রীরাই সুর সুর করে নেমে যেতে থাকলো প্লাটফর্মে। বিষাক্ত সাপটার হাঁপানি দেখে মনে হলো, কিছু সময় এখানে হাঁপিয়ে যাবে। তাই নামার চিন্তাটা একবার ভুঁস করে মাথায় চলে এলো। কিন্তু এখানেই যে থামবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। হয়তো দেখা যাবে কেউ নামতে পেরেছি, কেউ পারিনি। আবার নামার সময় সরিসৃপটা পেট ঘঁষতে ঘঁষতে চলতে শুরু করলে বিশ্রী ব্যাপার হয়ে যাবে। সিদ্ধান্ত নিলাম নামবো না। কিন্তু গাড়িটাও স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে না। স্টেশনের নাম গফরগাঁও। দিনের আলোতেই ভয়ঙ্কর, রাতের আাঁধারে পরিণত হয় রহস্য স্টেশনে। এই রহস্য স্টেশন গফরগাঁওয়ের অনেক কাহিনীই শুনেছি হামিদ ভাইয়ের আস্তানায়। হামিদ ভাই বলতে শিল্পী হামিদুল ইসলাম। একটি পরিপাটি আস্তানায় বসে তিনি শিল্পকর্ম করেন। আর করেন আড্ডাকর্ম। দুটোই সমানে সমান। আমাদের সাথে আড্ডায় বসেই তুলি হাতে রঙ তামাশা শুরু করেন। রঙদানি থেকে রঙ নেন। আর রঙের দুনিয়া থেকেও কিছুটা রঙ মাখিয়ে নেন। তারপর ক্যানভাসে আঁচর টানতে থাকেন। তখন তার আনমনা মনও দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। একটি থাকে রঙদানি ও ক্যানভাসের দিকে, অন্যটি আমাদের আড্ডায় অর্থাৎ রঙের দুনিয়ায়। রঙদানি আর রঙের দুনিয়ার রঙ মিলে মিশে ক্যানভাসে যা মূর্ত হয়, তা একেবারেই জীবন্ত। নিশিদলের জীবন্ত লোগোটি তিনিই বানিয়ে দিয়েছিলেন। একটি পূর্ণচন্দ্রকে ঘিরে চার চারটি নিশাচরের কাঠামো। কাছ থেকে দেখলে মায়াবি, দূর থেকে সাদা আর কালোর মিশেলের এই লোগোটাকে গা ছমছমে মনে হয়। একেবারে খাপে খাপ লোগো হয়েছে ওটা। নিশিদল মানেই তো গা ছমছমে। রাতের অন্ধকারে গা ছমছমে যাত্রা করবে, আর যাত্রার খবর শুনে অন্যদেরও গা ছমছম করবে। কেউ চুপ মেরে যাবে, কেউ পাগলামি বন্ধ করার কথা বলবে। তবে অন্য সবার চেয়ে আলাদা ফরিদ ভাই। সাংবাদিক সরদার ফরিদ আহমদ। তিনি বাউন্ডেলে ছিলেন, বাউন্ডেলেদের প্রশ্রয় দেন। নিজের বাউন্ডেলেপনার গল্প বলেন, বাউন্ডেলে নিশিদলকে সামনে বাড়তে বলেন। নিজেও চলেন তরতর করে। যেন কোনো পিছুটান নেই। সত্যি সত্যিই যেকোনো কাজ তার কাছে জলবত তরলঙ। যা করতে পারবেন না, তা নিয়ে মাথা ঘামান না। তবে যা নিয়ে মাথা ঘামান, তা করেই ছাড়েন। ফরিদ ভাইয়ের এই জলবত তরলঙ ছায়াটা নিশিদলের সাথে আছে, তাই নিশিদলও চলছে জলবত তরলঙ গতিতে। বলছিলাম হামিদ ভাইয়ের আস্তানার কথা। ওখানকার নিয়মিত একজন জাকির ভাই। কবি জাকির আবু জাফর। কবিতা লিখেন, তবে সবি সেই জলবত তরলঙ। সব জলবত তরলঙ হলে সেটা কবিতা হয় নাকি! কবিতা হতে হবে পাথরের মতো কঠিন, শিশার মতো নিñিদ্র। কিন্তু জাকির ভাইয়ের কবিতাগুলো জলের মতো তরল- ‘রাত্রির দরোজা খুলে বেরিয়েছে নিভাঁজ আঁধার/পৃথিবীর সব প্রাণ সব প্রেম সকল আরম্ভ/ সমস্ত সমাপ্তি আর মধ্যবর্তী যত আয়োজন/ অন্ধকার থেকে এসে দাঁড়িয়েছে আলোর অস্তিত্বে/ শেষতক আঁধার থেকে কুড়িয়েছি পৃথিবীর মুখ... অন্ধকার থেকেই বেরিয়ে আসে আলোর অস্তিত্ব। আলো জ্বালাতে হলে আঁধারেই জ্বালাতে হয়। আলোর ভেতর আলোর আলাদা অস্তিত্ব নেই। এর জন্য প্রয়োজন অন্ধকার। আর এই অন্ধকারের আলাদা অস্তিত্ব নিয়েই পৃথিবীর মুখ কুড়িয়ে আনতে চাইছে নিশিদল। নিশিদলের গতিবিধির অনেক কিছুই আলোচিত হয় হামিদ ভাইয়ের আস্তানায়। আমাদের এই নিশি নিশি খেলা হামিদ ভাই উপভোগ করলেও দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি একরকম আতঙ্কিত। মাঝে মাঝেই কর্মকাণ্ড সাময়িক স্থগিত রাখার উপদেশ দেন। আর নানান ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর কাহিনীও শুনান। এসব গল্পগুজবের মধ্যে বহুল আলোচিত একটি নাম গফরগাঁও। কারণ ওখানে মুনির ভাই আর মাজহার ভাইয়ের বাড়ি। হামিদ ভাইয়ের আস্তানার এই দুই আড্ডাবাজ একই মায়ের সন্তান। তবে একজন স্থির, অন্যজন অস্থির স্বভাবের। সপ্তাহে অন্তত কয়েকবার ঢাকা থেকে গফরগাঁও, গফরগাঁও থেকে ঢাকা যাতায়াত করেন মাজহার ভাই। তাও রাত বিরাতের ট্রেনে । আর গফরগাঁওয়ের লোকেরা ট্রেনে কখনো টিকেট কাটে না। তাই এদের সাথে ঝামেলা করতেও আসে না কেউ। ঝামেলা করতে গেলেই বিশাল রকমের গণ্ডগোল বেঁধে যাবে। কলার ধরে স্টেশনে নামাতে সময় লাগবে দশ সেকেন্ড। হই হই করে স্টেশন থেকে লোকবল ছুটে আসতে সময় নেবে আরো দশ সেকেন্ড। সবার হাতে থাকবে চ্যালা কাঠ। এরপর সাইজ করার পালা। গফরগাঁও স্টেশনে এমন অসংখ্য সাইজ করার গল্প বলেছেন মাজহার ভাই। কিছু তিনি নিজের চোখে দেখেছেন, কিছু লোকের মুখে শুনেছেন। তবে তিনি পই পই করে সাবধান করেছেন, কখনো গফরগাঁও গেলে যেন সাবধানে থাকি। ওখানকার হকাররাও বিপজ্জনক। ট্রেনটা গফরগাঁও স্টেশনে থামার পরই মাজহার ভাইয়ের কথা মনে পড়লো। তবে তার সাবধান বানিগুলো বেমালুমই ভুলে গেলাম। আমরা অধৈর্য্য হয়ে অপেক্ষা করছি, কখন হুঁইসেল বাজিয়ে আবার চলতে শুরু করবে গাড়িটা। কিন্তু অনেক সময় হয়ে গেল, তবুও চলল না। বেশ কয়েক স্টেশন ধরেই পেটটা কিছু একটা খাই খাই করছিল। কিন্তু ছাদের ওপর বসে থেকে একবার ঝালমুড়ি আর পপ কর্ন ছাড়া বেশি কিছু খেতে পারিনি। ভাবছি বড় রকমের একটা খাওয়ার জন্য অর্থ সম্পাদক তুহিনের ওপর চাপ প্রয়োগ করব। তখনি মুখ খুললো সাইমুম সাদ- পেটে ক্ষিধা লাগছে। আমি সমর্থন জানালাম। তুহিন ও আরিফ নিরব রইলো। তবে অতিরিক্ত রকমের সরব হয়ে উঠলো সাজন। ছাদের ওপর থেকে ঝুঁকে পড়লো নিচের দিকে। অযথাই ডাকাডাকি শুরু করল স্টেশনের লোকদের- এই ভাই এই, আমরারে একটু মুড়ি আইন্না দিতে ফারবা? প্রথমে আবেদন রাখল আট-দশ বছর বয়সি ছেলের কাছে। সে অপারগতা জানাতেই একটা গালিবুলেট ছাড়ল সাজন। এর পর অন্য আরেক পিচ্চিকে। এভাবে কয়েকজনকে অনুরোধ এবং গালাগাল করেও দমছিল না সে। মুড়ি আর চানাচুর খেয়েই ছাড়বে সাজন। অবশেষে আমি এগিয়ে তাকে নিবৃত্ত করলাম। কিন্তু তাতেও একেবারে দমলো না। আমাদের পাশ থেকে উঠে লাফিয়ে পাশের কম্পার্টমেন্টের ছাদে চলে গেল। ফিরে এলো অনেক সময় পর। এসেই জানালো সু খবরটা- ছাদে পিঠাওয়ালা উঠছে। আমি কইয়া আইছি, এম্মে (এদিকে) আইবো। আমি একটু চনমনে হয়ে উঠলাম। দেখলাম, সবাই যেন নড়েচড়ে বসলো। কিন্তু পিঠাওয়ালার খবর নেই। একটু পর দেখতে পেলাম পাশের কামরার ছাদে কয়েকজনকে পিঠা খাওয়াচ্ছে সে, তবে আমাদের দিকে আসছে না। আবারো গালির তুবড়ি ছাড়লো সাজন। সবই কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষার গালি। আঞ্চলিক হোক বা জাতীয়ই হোক, গালি সবসময়ই গালি। এর প্রভাবও ব্যাপক। কিন্তু এই হকারের ওপর গালাগালের কোনো প্রভাব পড়ছে বলে মনে হলো না। সে যতই গালাগাল করছে, হকারটা ওপাশে বসে থাকা কয়েকটা লোকের কুণ্ডলির সাথে ততই মিশে যাচ্ছে। একবার গলা বাড়িয়ে বলেছেও, এদিকে শেষ কইরা নেই। ট্রেন তখনো প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে ধৈর্য্য পরীক্ষা দিচ্ছে। ওদিকে ধৈর্য্য পরীক্ষা দিচ্ছে সাজন ও পিঠাওয়ালা। অনবরত পিঠাওয়ালাকে ডেকেই চলেছে, পিঠাওয়ালাও ওদিকেই পিঠা বিক্রিতে ব্যস্ত। আমিও অধৈর্য্য হয়ে উঠলাম, আরে ধুর, ওখানে তো মাত্র কয়েকটা লোক, ওদের কাছে পিঠা বিক্রি করতে এতো সময় লাগে নাকি? খাওয়ার আশাটা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ সময়ে এসে হাজির হলো পিঠাওয়ালা। খুব তাড়াহুরো, আমাদেরকে পিঠা দিয়েই নেমে যাবে সে। দ্রুত কয়েকটা পিঠা বের করে দিলো ভেতর থেকে। সাথে দিলো সরষে ভর্তা। আহ, এই শীত কাঁপুনে বাতাসের মধ্যে সরষে ভর্তা খেলে শরীরটা গরম হয়ে উঠবে। একটু বেশি ভর্তা চেয়ে নেবো পিঠাওয়ালার কাছ থেকে। কিন্তু সৌভাগ্য আমাকে চাইতে হলো না, এমনিতেই বেশি করে ভর্তা দিয়েছে আমাকে। তাকিয়ে দেখলাম অন্যদেরও তাই। যারপরনাই সন্তুষ্ট হলাম হকারের প্রতি। কিন্তু খুবই অসন্তুষ্ট হলাম সাইমুম সাদের আচরণে। ও বেচারা প্রথম খাই খাই করে চিৎকার করছিল, এখন পিঠা খাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। সাঙ্ঘাতিক বোকামি করছে ছেলেটা। আবার কখন না কখন ভাগ্যে খাবার জুটে, তার নাই ঠিক। একটু পরই পেট চুঁ চুঁ করবে, আবার কিছু একটা খাওয়ার জন্য উতলা হবে সাদ। ওর প্রতি বিরক্তির পর পরই চরম বিরক্ত হলাম আরিফের প্রতি। ইচ্ছে হলো ওকে ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেই। কারণ ও পানির বোতলটা ফেলে দিয়েছে। যাওয়ার সময় পিঠাওয়ালা এই বোতলটা ফ্রি দিয়ে গিয়েছিল আমাদের। আমিও নিজের ভাগের সরষে ভর্তা শেষ করে তুহিনের ভাগ থেকে আরো একটু নিয়ে উদরপুর্তি করেছি। তেষ্টাটা একেবারে জিহ্বায় এসে ঠেকেছে। কিন্তু যেই না বোতলটা চাইতে গেলাম, আরিফ সোজা জানিয়ে দিলো ফেলে দিয়েছে। আমার চেহারাটা ভ’তের মতো হয়ে উঠল। জিজ্ঞেস করলাম কেন? সে জানালো, পানির রঙটা ময়লা। মেজাজ আমার আরো বিগড়ে গেল। একটু পর তো হায় হুতাশ করেও পানি পাবো না। এখন স্রেফ একটু ময়লা বলে আস্ত বোতল ফেলে দিলো! রাগে গজগজ করতে করতে পিঠাওয়ালার চিতল পিঠা খেলাম। সরষে ভর্তাটুকুও চেটেপুটে শেষ করেছি। ট্রেন তখনো দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে। ট্রেনের হাঁপানিতে আমাদের কাছেও কেন যেন ছাদটা বিরক্তিকর হয়ে উঠলো। অনেকটা হঠাৎ করেই সবাই একমত হয়ে গেলাম, নিচে নেমে যাবো। কেন একমত হলাম, তাও ঠিক করে বুঝতে পারলাম না। নিচের দিকে ঝুঁকে এক পিচ্চিকে জিজ্ঞেস করলাম, ভেতরে সিট খালি আছে নাকি? প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে থাকা পিচ্চি চোখ দিয়ে ট্রেনের ভেতরটা জরিপ করে আমাদের জানালো সিট খালি আছে। ব্যস তরতর করে নামার জন্য উদ্যত হলাম সবাই। কিন্তু উদ্যত হলাম যত সহযে, নামাটা তত সহজ নয়। তুহিন তো ঝুঁকি নিতে চায় নি। সাদ থেকেই লাফিয়ে পড়লো প্লাটফরমে। পড়লো তো পড়লোই একেবারে চিতপটাং। পরে জানতে পেয়েছিলাম, তখন নাকি তুহিনের মনে হয়েছিল গোটা দুনিয়াটা কেবল ঘুরছে। সব অন্ধকার। চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলো না। আমি হাঁচড়ে-পাঁচড়ে কোনো রকম নামলাম। এর পর একি রকম ঝক্কি সামলে নামলো সাদ। আমাদের দেখাদেখি নামলো সাজনও। সবার শেষে আরিফ। আমাদের সৌভাগ্য, আরিফের নামা শেষ হওয়ার পরই সিঁটি বাজালো ট্রেন। এরপর ঝিরঝির করে চলতে শুরু করল। একটু আগে এই চলা শুরু হলেই আরিফের নামাটা আটকে যেতো। আমরা দ্রুত ঝিরিঝিরানি ট্রেনের দরজা ধরে একটি কামরার ভেতর চড়ে বসলাম। লক্ষ্য করলাম, তুহিন কামরায় ওঠেই বাম দিকে কোথায় যেন একটা সিটের ব্যবস্থা করে বসে পড়লো। আমরা বাকি তিনজন, একবার সিটের আশায় ডান দিকে কামরাটার শেষ মাথা থেকে ঘুরে এলাম। ওদিকে সুবিধা করতে না পেরে চলে এলাম আবার তুহিনের যায়গায়। দেখলাম বেচারা সিট নিয়ে চুপচাপ বসে আছে। কামরার এই অংশটায় একটা ডিজেল ইঞ্জিন চলছে। ওটা পুরো ট্রেনের বাতিগুলোর চার্জ যোগায়। ইঞ্জিনের কাছাকাছিই দরি দিয়ে অংশটা আটকানো। ভেবে পেলাম না, তুহিন কি করে এই দরি দেয়া অংশটা পাড়ি দিলো। যেহেতু তুহিন পাড়ি দিয়েছে, সেহেতু আমাদেরও দিতে হবে। বহু কষ্টে একে একে এই দরি দেয় অংশটা পার হলাম। ওপাশটায় ট্রেনের সাধারণ সিটের মতো সিট নয়, কেমন যেন এখানে কয়েকটা, ওখানে কয়েকটা এলোমেলো সাজানো। আরিফকে দেখলাম ক্লান্ত। ধুক পুক করে চলতে থাকা ডিজেল ইঞ্জিনটার পাশ ঘেঁষে একেবারে কোনার দিকে সিটের ব্যবস্থা করে নিয়েছে সে। ওদিকে সাদও যেন কোথাও বসতে পেরেছে। আমি তখনো দাঁড়িয়ে। বাম দিকে তাকিয়ে দেখি সাজনও আমাদের সাথেই আছে, একটু ঠেলে ঠুলে বসার যায়গাও করে নিয়েছে। অবশেষে আমিও তুহিনের পাশে যায়গা পেলাম। জায়গা পেলাম এবং বসলাম। তাকিয়ে দেখলাম, সামনের সিটে ছোট্ট একটি মেয়ে শুয়ে আছে। কিছু সময় ঘুমুচ্ছে। আবার এ পাশ ওপাশ করে গড়াগড়ি খাচ্ছে। মাঝে মাঝে চোখ বড় বড় করে আমাদের দেখছে। নানা ধরনের চিন্তা খাবি খাচ্ছে আমার মাথায়। এই মেয়েটা একদিন বড় হবে। ওরও নাতি-নাতনি হবে। তখন হয়তো আজকের এই ট্রেনে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যাত্রার গল্পটা নাতি-নাতনিদের সাথে বলবে সে। হয়তো সে সময়ের ট্রেনগুলো থাকবে অন্যরকম। আগামীর সেই নাতি-নাতনিরা আজকের এমন ট্রেনের কথা ভেবে শিহরিত হবে। আজকের এই মেয়েটা বুড়ি দাদি বা নানি হয়ে বিপুল উৎসাহে এ গল্পগুলো চালিয়ে যাবে। হয়তো তার গল্পে আমরাও ঢুকে যেতে পারি এভাবে- জানিস, জানিস সেই সময় না নিশিদল বলতে একটা দল ছিল। নাতি-নাতনিরা জিজ্ঞেস করবে, তাই নাকি! এই দলটা কি নিশিতে চুরি করতো? আজকের এই মেয়েটা হয়তো বলবে, চুরি করতো কি না জানি না। তবে সেই দিন আমি যখন ঘুমিয়ে ছিলাম, তখন নিশিদল লেখা কালো রঙের গেঞ্জি পরে চারজন লোক উঠেছিল ট্রেনে। এসব আজগুবি ভাবনার কিছুটা তুহিনের সাথে শেয়ার করলাম। তারপর, তারপর কী হলো? তারপর আর কিছুই হলো না। কেবল ডিজেল ইঞ্জিনের ধুকপুকানি। আর এই ধুকপুকানিটাই আমাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। ভাসিয়ে দিল উড়াল জগতে। মনে হলো স্বপ্ন দেখছি। হ্যাঁ, কিছু একটা দেখছি। তবে কি দেখছি? সবই এলোমেলো। স্বপ্নের ভেতর যেমন একটা দৈত্য থাকে, ওটা হেই হেই করতে করতে তেড়ে আসে। একেবারে ছুঁই ছুঁই করেও ছুঁতে পারে না। দৈত্যের ভয়ে কখনো দৌড়ে চলি, কখনো বাতাসে ভেসে, কখনো আকাশে উড়ে। দুই হাতে পাখির মতো ডানা গজায়। কী আরাম। আকাশের নীলের নিচ দিয়ে উড়ে বেড়াই। আবার দৈত্যটাকে খেপানোর জন্য নিচে নেমে আসি। ঘোঁত ঘোঁত করতে করতে ওটা আমাকে ছুঁইয়ে দেয়। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি উড়ালডানা দুটো খসে পড়েছে। তারপর আবার পেছন থেকে সেই দৈত্যের তাড়া, আবার দৌড়। মনে হলো অদ্ভুত এক রুপকথার দেশে চলে গেছি। স্বপ্নের ভেতর যেমন ইচ্ছে করে স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তেমনভাবেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারলাম। মাঝে মাঝে স্বপ্নের ভেতর দ্বিধা দ্বন্দ্বেও পড়তে হয়, ওটা কি স্বপ্ন, না বাস্তব? অনেক সময় স্বপ্নকে বাস্তব মনে হয়। আবার কখনো কখনো স্বপ্নের ভেতরে থেকেও বলে দেয়া যায়, ওটা স্বপ্ন। আর যখন নিশ্চিত হওয়া যায় ওটা স্বপ্ন, তখন কিছু করতে বাঁধা নেই। যা খুশি তাই করো। পাঁচ তলা থেকে ঝাঁপ দিলেও ক্ষতি নেই। কারণ ওটা বাস্তব নয়, স্বপ্ন। আমিও চলে গেলাম সেই যা খুশি তা করোর রাজ্যে। তখন মনে হলো, কোনো কিছুই বাস্তব নয়, সবই স্বপ্ন আর স্বপ্ন। একবার মনে হলো হৈ-হুল্লোড়, একবার সাইমুম সাদের গলার শব্দ, একবার আরিফের গলা। ওদের কথাগুলোই মনে হলো পাখিদের সুরেলা কিচির মিচির। আবার এগুলোই রুপান্তরিত হলো সিংহের গর্জনে। স্বপ্নের দেশে আমি অবাক। হচ্ছেটা কী এসব? কী হচ্ছে বা না হচ্ছে এর কোনো কিছুই বলতে পারব না আমি। বলতে পারেনি তুহিন, আরিফ। তবে পুরোটাই বলতে পেরেছে সাইমুম সাদ। কারণ সে পিঠাওয়ালার সেই চিতল পিঠা আর সরষে ভর্তা খায়নি। ভর্তা না খেলেও খুব সহজে ব্যাপারটা ধরতে পারেনি সে। মিনিট বিশেক পর নাকি পরের স্টেশনে ট্রেনটা থামল। কথা ছিল গফরগাঁওয়ের পরের স্টেশনেই নেমে যাবো। এ কারণেই সাইমুম সাদ আমাদের ডাকল। পাশাপাশি ট্রেনের টিটি এসেও ডাকাডাকি শুরু করল। দুই ডাকাডাকির পর আমরা নাকি স্বপ্নের জগত ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। কিন্তু আমাদের দেখে সাদের মনে হলো অন্য জগতের লোক। দাঁড়িয়ে আছি, তবুও চোখ জুড়ে রাজ্যের ঘুম। তারপরও আমাদেরকে স্বাভাবিক ভাবলো সাদ। সে ততক্ষণে ট্রেন থেকে স্টেশনে নেমে গেছে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলো আমাদের নামার নাম গন্ধ নেই। নিচ থেকে ডাকছে। কিন্তু সারা নেই। ট্রেন ঝির ঝির করে চলতে শুরু করল। গলার জোর বাড়িয়ে দিলো সাদ। এবারো ফলাফল শূন্য। ট্রেনের গতি আরো বাড়ল। বাধ্য হয়ে আবারো ট্রেনে চড়তে হলো সাদকে। উঠার পর ঘটনা তদন্ত করার জন্য আমার দিকে এগিয়ে এলো সে। আমার অবস্থা গুরুতর। হাঁটতে গিয়ে লোকের ওপর উল্টে পড়ছি। মুখ দিয়ে সাদা ফেনা বের হচ্ছে। আমি তখন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। ট্রেন থেকে পড়ে যাওয়ার অবস্থা। তুহিন চুপচাপ। কোনো কথা নেই। হাঁটতে গিয়ে অন্যের সিটে ঢলে পড়ছে। তবে আরিফের অবস্থা কিছুটা ভালো। তিন তিনটা জীবন্ত লাশ দেখে ভড়কে গেল সাদ। বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করল। তখনই মনে হলো সেই পিঠাওয়ালার কথা। একটা কিছু করতে হবে তাকে। নিজের ব্যাগের ভেতর ক্যামেরাটা নিরাপদে আছে কি না দেখলো। তারপর সবার পকেট থেকে মোবাইল ফোনগুলো হাতিয়ে নিলো সাইমুম সাদ। আমাদের ঘিরে অনেক লোকের জটলাও তৈরি হতে চেয়েছিল। কিন্তু সে সুযোগ সন্ধানীদের সুযোগ করে দেয়নি। জামালপুর স্টেশনে ট্রেন থামার পর আমাদের নিয়ে নেমে গেল সাইমুম সাদ। রাত তখন সাড়ে তিনটা। মধ্যরাতে তিনটা অবচেতন মানুষকে নিয়ে কী করবে, কোথায় যাবে দ্বিধায় পড়ে গেল সে। আমাদের এ অবস্থা দেখে সাদের অবস্থাও যায় যায়। সিদ্ধান্ত নিলো, যেভাবেই হোক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে সে। কিন্তু এত রাতে ডাক্তার কোথায় পাবে! মাথাটা ধরে এলো সাদের। তিনজনকে বসিয়ে রেখেছে স্টেশনের মেঝেতে। আমাদের রেখেও যেতে পারছে না। তাছাড়া এক জনের পক্ষে তিনজনকে চোখে চোখে রাখাটা কঠিন। তখনি সাদ লক্ষ্য করল, তার তিন রোগী ঢুলতে ঢুলতে হাঁটতে শুরু করেছে। একেকজনের গন্তব্য একেক দিকে। ওর প্রতি কারো খেয়াল নেই। এমনকি আমরা ওকে চিনতে পারছি কি না, সেটা নিয়েও ও দ্বিধায় পড়ে গেল। আমি তখন হাঁটতে হাঁটতে পড়েও যাচ্ছিলাম। এ অবস্থায় নাকি তিন মাতালের মধ্যে একবার বেশ ভাবও হয়ে গিয়েছিল। একজন পড়ে গেলে অন্য জন এগিয়ে এলো তোলার জন্য। ব্যস, এগিয়ে আসা পর্যন্ত সার। কিন্ত কেউ কাউকে উদ্ধার করার মতো অবস্থায় ছিল না। তিন তিনটি জীবন্ত বোঝার মধ্যে আরিফের অবস্থাই একটু ভালো। তাই দুই মাতালের দায়িত্ব এক মাতাল আরিফের ওপর দিয়ে রিকশা ডাকতে গেল সাদ। এর মধ্যে অবশ্য মাতাল আরিফের নির্দেশে একবার আচার কিনে আনতে বাধ্য হয়েছিল সে। অবশেষে দুই দুটি রিকশা ডেকে এনে, রিকশাওয়ালাদের সহযোগিতায় আমাদের জামালপুর সদর হাসপাতালে নেয়া হলো। তিনজনকে ভর্তি করা হলো। তবে কোনো বিছানা খালি নেই। মেঝেতেই থাকতে হবে। আমি ওসব ঘটনার কিছুই বলতে পারি না। আছি কেবল যা খুশি তা করোর রাজ্যে। যা ইচ্ছে হচ্ছে তাই করছি। কিন্তু কী করেছি, কিছুই মনে নেই। সব ঘটনা সাদের মুখ থেকে শুনে শুনে লিখতে হচ্ছে। একটা কম্বলে গাদাগাদি করে তিনজনকে শুইয়ে দেয়া হলো। এরপর নার্স স্যালাইন লিখে দিল সাইমুম সাদকে। সে বাইরে থেকে তিন তিনটি স্যালাইন কিনে আনলো। এবং রগের সাথে স্যালাইন লাগিয়ে দেয়া হলো। স্যালাইন চললো। প্রথম দিকে আমি একেবারেই জ্ঞানশূন্য। আরিফের কিছুটা জ্ঞান আছে। আর তুহিন আমার আগে জ্ঞান ফিরে পেয়েছে। তবে সকালের দিকে যখন আমি নড়াচড়া করতে শুরু করলাম, তখন থেকে শুরু হলো ফিল্মি আবহ। সাদকে ডেকে বিজ্ঞের মতো জিজ্ঞেস করছিলাম আমি এখানে কেন, কিভাবে? সাদ বার বারই জবাব দিচ্ছিল। তবুও আমি জিজ্ঞেস করছি এবং পরমুহুর্তেই আবার স্থবির হয়ে যাচ্ছি। আমাকে নিয়ে হাসপাতালজুড়ে রসালো একটা পরিবেশ তৈরি হলো। প্রথম দিকে এক সাথে তিন জনকে স্যালাইন দেয়ার মতো ব্যবস্থা না থাকায়, আরিফকে দূরে একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু সেখানে সঙ্গহীন অনুভব করায় সে আবার আমাদের কাছেই চলে এলো। ওর কিছুটা হুঁশ হওয়ার পর হাসপাতালে রোগীদের ভিড়, স্বজনদের কোলাহল, আর আমাদের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে ভীষণ রকম যন্ত্রণা হচ্ছিল। তখনো পূর্ণ জ্ঞান ফেরেনি। সবকিছু আবছা আবছা দেখছিল। কানে শব্দ ঢুকছিল, তবে বুঝতে পারছিল না। আমি ছিলাম সবচেয়ে বেশি বেহুঁশ। আমার হাতে স্যালাইন লাগানোর সময়ও নাকি রগ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। একটু নড়াচড়া শুরু করার পর নিজেই স্যালাইনের গতি বাড়িয়ে দিচ্ছিলাম, আবার কমিয়েও দিচ্ছিলাম। সকালের দিকে সবার জন্য রুটি-কলা নিয়ে এলো সাদ। তবে এগুলো মুখে তুলে খাওয়ার মতো শক্তি ছিল না আমার। কেউ একজন মুখে তুলে দিল। এতে একটু খেয়েই ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছি আমি। শরীরে ঝাঁকুনি দেয়ার পর একটু চোখ মেলে আবার খাওয়া শুরু করলাম। তারপর আবার ঘুম। চিত্তাকর্ষক এ দৃশ্যটা দেখার জন্য হাসপাতালের অনেক রোগীরাও জটলা করেছিল আমার পাশে। কিন্তু তাদের কৌতুহলী দৃষ্টিগুলোক থোরাই কেয়ার করে বেহুঁশ হয়ে ঘুমিয়ে গেলাম আমি। এর পর যখন উঠলাম, তখন ক্যামেরা হাতে রোগীদের ছবি তুলতে শুরু করলাম। এই দৃশ্যটা স্বপ্নের মতো হালকা দোলা দিয়ে যাচ্ছে আমাকে। একটু মনে করার চেষ্টা করলে সত্যি সত্যিই মনে হয় হাসপাতালের মতো কোনো একটা জায়গায় আছি আমি। কিন্তু নিজের কাছেই মনে হচ্ছে ঘটনাটা সত্যি নয়, স্বপ্ন। আমি স্বপ্ন দেখছি। কাজেই স্বপ্নে যা খুশি তাই করা যায়। ইচ্ছে হলো হাসপাতালের রোগীদের কিছু ছবি তুলে রাখা। যতœ করে তুলতে পারলে এগুলো অসাধারণ সংগ্রহ হবে। হোক না সেটা স্বপ্নের সংগ্রহ। তুলতে শুরু করলাম। ক্লিক, ক্লিক, ক্লিক। স্বপ্নের প্রতিটি ক্লিক যে বাস্তবেও ছবি তুলে ফেলছে সেটা বুঝতে পারিনি। বুঝতে পরিনি অনেক কিছুই। আমার ঘুমটা কখনো পরিষ্কারভাবে ভাঙেনি। সেখানকার কোনো স্মৃতিই পরিষ্কারভাবে মাথায় নেই। এমনকি ঢাকায় আসার পর দুই দিন কোনো কিছু পরিষ্কারভাবে বলতে পারি না। ধূয়ার ভেতর যতটুকু আছে, সেই মুহুর্তগুলো দুই তিনটার বেশি হবে না। এর মধ্যে একটা ছবি তোলার মুহুর্ত। তবে জ্ঞান ফেরার পর অনেক কিছুই পরিষ্কারভাবে মনে আছে তুহিনের। ঘুম ভাঙার পর হাতে স্যালাইন লাগানো দেখে চমকে উঠে সে। তখন থেকেই ওর মনে হতে লাগলো হাসপাতালে বেশি সময় থাকা ঠিক হবে না। দ্রুত ঘরে ফিরতে হবে। ছুটে গেল নার্সের কাছে। কিন্তু নার্স অসুস্থ অবস্থায় আমাদের ছাড়তে রাজি নয়। ওদিকে ফেসবুকে নিশিদলের পেজে লাইভ আপটেড চলছিল। সাইমুম সাদ মুহুর্তের খবর মুহুর্তেই পেজে আপ করে দিচ্ছিল। এতে আমাদের এই অবস্থার খবর অনেকের কানেই চলে গেছে। সাইমুম সাদের ফোন তখন ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। একের পর এক ফোন আসছে। এই করতে করতে দুপুর গড়িয়ে এলো। হাসপাতাল থেকে খাবার দেয়া হলো দুই টুকরো করে পাঙ্গাস মাছ, তিন টুকরো আলু আর মাসকলাইয়ের ডাল। বড় গামলায় অল্প কিছু ভাত। এক গামলায় নিয়ে চারজন চার দিক থেকে খাওয়া শুরু করলাম। কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর নাকি আমরা তিন জনের কেউ এই খাবারের কথা স্বীকার করিনি। আমি সাদের সাথে ঠিকমতো কথা বলছি, ও ভাবছে সুস্থ হয়ে গেছি। একটু পর আবার জিজ্ঞেস করছি, এখানে কিভাবে এলাম? এসব তুলনায় আরিফ তাকে যথেষ্ট শান্তিতে রেখেছে। সে অনেক সময় উদাস হয়ে বসে থাকে, তারপর হঠাৎ আবদার করে-বাসায় চলে যাবো। অন্য দিকে তুহিন তার অফিসের বসের ভিজিটিং কার্ড খুঁজতে ব্যস্ত। আধা ঘণ্টা তন্ন তন্ন করে খুঁজে আবার ঘুমিয়ে গেল সে। শেষে কার্ডটা তার পকেট থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে। আর তুহিনের মানিব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে আমার পকেট থেকে। এটা কী করে ঘটলো আমার জানা নেই। আবার কখন উদ্ধার করা হলো সেটাও মনে নেই। তবে ধারণা হচ্ছে, কেউ আমাকে চোর প্রমাণ করার জন্য এমন ষড়যন্ত্র করে থাকতে পারে। দুপুরের পর আমাদেরকে উদ্ধার করতে একজন এলেন। তিনি আব্বার সহকর্মী। বাড়ি জামালপুরে, তখন বাড়িতেই ছিলেন। আব্বার ফোন পেয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন। আমাদেরকে মাতাল অবস্থায়ই পেলেন। হাসপাতালের নার্সরা পুরোপুরি সুস্থ না করে ছাড়তে চাইছিলেন না। আরো এক দিন থেকে যেতে হবে। কিন্তু আরিফ আর তুহিনের অস্থিরতায় পালিয়ে চলে আসার পরামর্শ দিলেন। অবশেষে আব্বার সেই কলিগের সহযোগিতায় আমরা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলাম। বেরুলাম ঠিক, আমি তখনো স্ব জ্ঞানে নেই। হাঁটছি, কথা বলছি। হোটেলে বসে খাচ্ছি। তারপরও কিছু বলতে পারছি না। ভদ্রলোক আমাদের হোটেলে নিয়ে ভর পেট খাওয়ালেন। মিষ্টির দোকানে নিয়ে মিষ্টিও খাওয়ালেন। তারপর সবাইকে বাসে তুলে দিয়ে নিজেও ঢাকায় আসতে চাইলেন। কিন্তু সাইমুম সাদ আর আরিফ জানালো, এরা দুইজনই আমাদের দায়িত্ব নেয়ার জন্য যথেষ্ট। অবশেষে পুরো দায়িত্ব নিয়ে এরা আমাদের ঢাকায় নিয়ে এলো। দুই দিন পর পূর্ণ জ্ঞান ফিরে এলো। মাথার ঝিম ঝিম থাকলো আরো সাত দিন। এর পর নিজের মস্তিষ্ককে আগের অবস্থায় ফিরে পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করলাম। কারণ অজ্ঞান পার্টির খপ্পড়ে পড়ে অনেক লোকেরই মারা যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে। সে তুলনায় আমার ক্ষয়-ক্ষতি তেমন কিছুই হয় নি। শুধু ঢাকা ফিরে আসার দুই দিন পর বাম পায়ের নিচের দিকটায় মাঝারি আকারের একটা জখম আবিষ্কার করলাম। কিভাবে হলো জখমটা? তুহিন জানালো জামালপুরে দুপুরের খাবারের পর মিষ্টির দোকানে যাচ্ছিলাম আমরা। এর জন্য রাস্তা ছেড়ে ফুটপাতে উঠতে হবে। সামান্য উঁচু যায়গা। পা টা একটু উঁচু করে দিলেই হয়ে যায়। কিন্তু এতটুকু উচ্চতায় উঠতেও ব্যর্থ হলাম আমি। হুমড়ি খেয়ে সোজা পড়ে গেলাম রাস্তায়। পাশেই নির্বিকার দাঁড়িয়ে থেকে আমার পতন দেখছিল তুহিন। সামান্য ভদ্রতা দেখানোর জন্যও এগিয়ে আসেনি সে।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment