Tuesday, May 19, 2015

মোদির ত্রিদেশীয় সফরে ভারতের দ্বিমুখী ঋণ কূটনীতি:আরটিএনএন

মোদির ত্রিদেশীয় সফরে ভারতের দ্বিমুখী ঋণ কূটনীতি নিজস্ব প্রতিবেদক আরটিএনএন ঢাকা:  দারিদ্রপীড়িত ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণ কূটনীতি শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে ভারত কিছু কিছু উন্নয়নশীল দেশে ঋণ দিচ্ছে। উদ্দেশ্য এসব দেশে ভারতের প্রভাব বৃদ্ধি। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এশিয়ার চলমান ত্রি-দেশীয় সফরে ভারতের ঋণ কূটনীতির দ্বিমুখী নীতির দৃষ্টিকটূ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। একই সফরে মোদি দক্ষিণ কোরিয়া থেক
ে ১,০০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছেন আবার মঙ্গোলিয়াকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া মোদির চীন সফরকালে ভারতের সাথে চীনের ২,২০০ কোটি ডলারের চুক্তি হয়েছে তার বেশিরভাগই হবে ভারতের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানকে চীনা ব্যাংকের ঋণ। ১৪ মে চীন সফরের মাধ্যমে মোদির তিন দেশ সফর শুরু হয়। চীন থেকে তিনি যান মঙ্গোলিয়ায়। এরপর দক্ষিণ কোরিয়া সফর শেষে মঙ্গলবার তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে। জুনের প্রথম দিকে মোদির ঢাকা সফরের কথা রয়েছে। এ সময় বাংলাদেশকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেও ভারত বাংলাদেশকে ১০০ কোটি ডলারের ঋণ দিতে চুক্তি করেছিল। তবে সেই ঋণের কঠিন শর্ত নিয়ে বাংলাদেশের অনেক অর্থনীতিবিদ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। চীনের সাথে ২২০০ কোটি ডলারের চুক্তি মোদির ভারতসফরকালে ভারত ও চীনের মধ্যে ২,২০০ কোটি ডলারের (২২ বিলিয়ন) ২১টি চুক্তি সই হয়েছে। শনিবার চীনের সাংহাইয়ে দুই দেশের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এই চুক্তি সই হয়। ভারতের কর্মকর্তারা জানান, এসব চুক্তি অনুসারে ভারতের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চীনের ব্যাংকগুলো আর্থিক সহায়তা দেবে। এ ছাড়া টেলিকম, ইস্পাত, সৌরশক্তি ও চলচ্চিত্র খাতেও দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০০০ কোটি ডলার ঋণ দক্ষিণ কোরিয়ায় মোদির দুদিনের সফরের প্রথম দিনে ভারতকে ১০০০ কোটি ডলর ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে সিউল। এ লক্ষ্যে দুটি দেশের মধ্যে সোমবার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তির আওতায়  দক্ষিণ কোরিয়ার স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ফাইন্যান্স (কৌশলগত এবং অর্থ) মন্ত্রণালয় এবং এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব কোরিয়া ভারতকে ১০০০ কোটি ডলার ঋণ দেবে। ভারতে স্মার্ট সিটি তৈরি, রেলওয়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ ঋণ ব্যবহার করা হবে। মঙ্গোলিয়াকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেবে ভারত চীনের পর মঙ্গোলিয়া সফরে গিয়ে দেশটিকে ১০০ কোটি ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বলা হচ্ছে, চীনের পাশের এই দেশটিতে প্রভাব বাড়াতেই দুই দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে রবিবার এই প্রতিশ্রুতি দেন মোদি। মোদি মঙ্গোলিয়ার প্রধানমন্ত্রী চিমেদ সাইখানবাইলেগের সঙ্গে বৈঠকে খনিজ সম্পদে ভরপুর এই দেশটির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। মঙ্গোলিয়াকে ‘বিশ্বের গণতন্ত্রের নতুন আশার আলো’ আখ্যা দেন তিনি। আরো বলেন, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য ভারত ও মঙ্গোলিয়া ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। মোদির সফরে ভারত ও মঙ্গোলিয়ার মধ্যে ১৪টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এসব চুক্তির বিষয় প্রতিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং স্বাস্থ্য। ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মোদি বলেন, ‘মঙ্গোলিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে এই সহায়তা দিয়ে আমি আনন্দিত।’ বাংলাদেশের সাথে ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন ঢাকা সফরে ১০০ কোটি ডলারের একটি ঋণ চুক্তি সই হওয়ার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। এখন তারই প্রস্তুতি চলছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে। এর আগে কংগ্রেস শাসনামলে ২০১০ সালে প্রথম এলওসির আওতায় ১০০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি সই হয়েছিল, যা দিয়ে পদ্মা সেতু, বিআরটিসির জন্য ডাবল ডেকার, সিঙ্গেল ডেকার বাসসহ রেলের বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। জানা গেছে, মোদির সফরে সম্ভাব্য দুই চুক্তির একটি হলো ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ চুক্তি এবং অন্যটি উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তি। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি ও এর আওতায় বাণিজ্য ও নৌ-ট্রানজিট বিষয়ে প্রটোকল (পিআইডাব্লিউটিটি) আরো পাঁচ বছরের জন্য নবায়ন করার কথা রয়েছে। সোমবার বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা এ প্রস্তাবে অনুমোদনও দিয়েছে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় স্বাক্ষরিত সাংস্কৃতিক সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তিটি মোদির সফরে নবায়নের কথা রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দুটি এমওইউ স্বাক্ষরিত হতে পারে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, ভারত দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয় গত ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় এক বৈঠকে। ওই বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব অলক কুমার সিনহা বলেন, উচ্চপর্যায় থেকে বাংলাদেশকে বড় আকারের ঋণ দেওয়ার বিষয়ে সবুজ সংকেত রয়েছে। এরপর ৫ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহুপক্ষীয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক জ্যেষ্ঠ সচিব সুজাতা মেহতা তিন দিনের ঢাকা সফরে এসে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে দেখা করে দ্বিতীয় এলওসির আওতায় ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দেন। দ্বিতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় কার কত চাহিদা, তা জানতে সব মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় ইআরডি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত এক মাসে ১৪টি প্রকল্প জমা হয়েছে ইআরডিতে। এর মধ্যে রয়েছে সড়কের চারটি, রেলের চারটি, আইসিটির দুটি, বিদ্যুতের তিনটি এবং নৌ-মন্ত্রণালয়ের একটি। বিদ্যুৎ বিভাগের তিন প্রকল্প হলো বড়পুকুরিয়া থেকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ, সাব-স্টেশনের দক্ষতা বাড়ানো, ধনুয়া-কড্ডা গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন নির্মাণ প্রকল্প। সড়কের চারটি হলো আশুগঞ্জ নদীবন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত বিদ্যমান ৫১ কিলোমিটার সড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণ, বিআরটিসির জন্য ৫০০টি ট্রাক, ডাবল ডেকার ও আর্টিকুলেটেড বাস সংগ্রহ এবং রাস্তা সংস্কারের আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা প্রকল্প। নৌপরিবহনের প্রকল্পটি হলো আশুগঞ্জ বন্দর উন্নয়ন। আইসিটির দুটো প্রকল্প হলো আইটিতে উচ্চ শিক্ষা ও দক্ষতা বাড়ানো এবং ১২ জেলায় আইটি পার্ক নির্মাণ। রেলের প্রকল্পের মধ্যে আছে খুলনা-দর্শনা সেকশনে ডাবল রেললাইন, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ার মধ্যে ডুয়েল গেজ রেললাইন, সৈয়দপুর ওয়ার্কশপে নতুন ক্যারেজ নির্মাণ এবং পার্বতীপুর-কাউনিয়া সেকশনে বিদ্যমান মিটার গেজকে ডুয়েল গেজে রূপান্তর। কর্মকর্তারা বলছেন, এগুলো চূড়ান্ত নয়। নতুন প্রকল্পও আসতে পারে। এই ১০০ কোটি ডলার ঋণের সুদহারসহ অন্যান্য শর্ত নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো আলোচনা হয়নি। তবে প্রথম দফায় যে হার ছিল, তাই থাকবে বলে আভাস পাওয়া গেছে। ভারতীয় এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ চুক্তি অনুযায়ী ৭৫ শতাংশ পণ্য ভারত থেকে আনতে হবে। এটি বাধ্যতামূলক। বাকি ২৫ শতাংশ পণ্য ঠিকাদার অন্য যেকোনো দেশ থেকে আনতে পারবে। শর্তে আরো বলা আছে, ঠিকাদার নিয়োগ হবে ভারত থেকে। আর ঋণের সুদহার হবে ১ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ খরচ করতে না পারলে বাংলাদেশকে জরিমানা দিতে হবে দশমিক ৫ শতাংশ। পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ২০ বছরে এ ঋণ পরিশোধ করা যাবে। ইআরডিতে পাঠানো এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রকল্প প্রস্তাবটি হলো বড়পুকুরিয়া থেকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ। এর খরচ ধরা হয়েছে ৩৭ কোটি ডলার। এর মধ্যে ভারতের কাছ থেকে ২২ কোটি ডলার পাওয়ার আশা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে দুটি প্রস্তাব পাওয়া গেছে। প্রথমটি হলো ১২ জেলায় আইটি পার্ক নির্মাণ। এটি বাস্তবায়নে ভারত থেকে ২০ কোটি ডলার আর আইটিতে উচ্চ শিক্ষা ও দক্ষতা বাড়ানোর জন্য নেওয়া প্রকল্পে এক কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। নতুন এলওসিতে আশুগঞ্জ নদীবন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত ৫১ কিলোমিটার সড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পটি ১ নম্বরে থাকবে বলে জানা গেছে। এর খরচ ধরা হয়েছে ২৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে ভারতের কাছ থেকে ঋণ পাওয়া যাবে ২৩ কোটি ডলার। বাকি চার কোটি ডলার সরকারের কোষাগার থেকে জোগান দেওয়া হবে। বিআরটিসির জন্য ৫০০টি ট্রাক কেনার প্রস্তাব করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। খরচ ধরা হয়েছে পাঁচ কোটি ডলার। যার মধ্যে ভারত থেকে চার কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার আশা করছে সরকার। সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে বড় বড় উপকরণ কেনার জন্য ভারতের কাছ থেকে পাঁচ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। মন্তব্য      

No comments:

Post a Comment