Thursday, November 13, 2014

আন্দোলনেই মীরজাফর সরকারকে সরানো হবে: খালেদা :Natun Barta

কিশোরগঞ্জ: বর্তমান সরকারকে নব্য মীরজাফর আখ্যা দিয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, “আন্দোলনের মাধ্যমে নব্য মীরজাফর সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো হবে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে। আগের মতো আপনারা আমার ডাকে সাড়া দিয়ে আসবেন। পরিবর্তন দেখতে পারবেন।” সরকার সব ক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত- এমন মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, “তারা দুর্নী
তিকে বৈধতা দিচ্ছে। অর্থমন্ত্রী নিজেই এ কথা স্বীকার করেছেন।” দুর্নীতি দমন কমিশনকে তিনি ‘দুর্নীতি কমিশন’ বলেও মন্তব্য করেন।   বুধবার বিকালে কিশোরগঞ্জের সরকারি গুরুদয়াল মাঠে আয়োজিত ২০ দলীয় জোটের জনসভায় খালেদা জিয়া এসব কথা বলেন। বিকাল চারটা ২০ মিনিটে খালেদা জিয়ার বক্তব্য শুরু হয়। হাওরবেষ্টিত কিশোরগঞ্জে প্রায় আট বছর পর এলেন খালেদা জিয়া। সমাবেশে নেতাকর্মীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে। বক্তব্যের শুরুতে খালেদা জিয়া সমাবেশে আগতদের ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানান।   প্রায় এক ঘণ্টার বক্তব্যে খালেদা জিয়া সরকারের নানা সমালোচনা করেন। মানুষ হত্যায় র্যাতব জড়িত এমন অভিযোগ করে এতদিন প্রতিষ্ঠানটি বাতিলের দাবি করলেও  দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য তাদের মিশনে না নেয়ার জন্য জাতিসংঘসহ অন্যান্য সংস্থার প্রতি আবেদন করেন। পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হত্যায় পুলিশ জড়িত এমন অভিযোগ করে বিদেশীদের পুলিশের কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিক্রি বন্ধের দাবি জানান। এ ছাড়া বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশের উন্নয়নে কী কী পদক্ষেপ নিবে কিশোরগঞ্জের নেতাকর্মীদের কাছে সে আশ্বাসও দেন খালেদা। এর আগে বেলা দুইটার দিকে সড়কপথে কিশোরগঞ্জে পৌঁছান খালেদা জিয়া। পরে সার্কিট হাউজে অবস্থান করে বিকেল সমাবেশস্থলে আসেন। কিন্তু ততক্ষণে কিশোরগঞ্জ ও আশপাশের এলাকা থেকে বিএনপি ও শরিক দলের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি মাঠ ছাড়িয়ে শহরের সড়কে উপচে পড়ে। অন্যান্য সমাবেশের মতো এখানেও জোটের শরিক জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত নেতাদের মুক্তির দাবিতে ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে মাঠে হাজির হন। জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. শরিফুল আলম সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। সরকারের যত সমালোচনা সরকারকে অবৈধ উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, “দেশে কোনো নির্বাচিত সরকার নেই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে মানুষ ছিল না, কুকুর বসা ছিল। কর্মকর্তারা বসে বসে ঘুমিয়েছে। তার পরও তারা (সরকার) কীভাবে নির্বাচিত দাবি করে? এই সংসদ অবৈধ। অবৈধ সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই।” তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকার না থাকায় দেশে কোনো বিদেশী বিনিয়োগ নেই। দেশের ব্যবসায়ীরাও চাঁদা দেয়ার ভয়ে ব্যবসা করতে পারছেন না। বিএনপি নকল বন্ধ করে শিক্ষা খাতে ব্যাপক উন্নয়ন করলেও বর্তমান সরকার নকল সাপ্লাই দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন খালেদা জিয়া। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিমের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আগে পুলিশ ধ্বংস করেছিলেন। এখন স্বাস্থ্য খাত ধ্বংস করছেন।” বিএনপির চেয়ারপারসন অভিযোগ করেন, “আওয়ামী লীগ সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে। বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করেছে। মিডিয়াকে সম্পূর্ণভাবে দখল করেছে। হিন্দু সম্প্রদায়সহ অন্যান্য ধর্মের মানুষের জমি দখল, মন্দির ভাঙচুর করে আওয়ামী লীগ। জনগণের টাকা ব্যাংকে রাখলেও তারা (আওয়ামী লীগ) এ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করছে। অথচ অর্থমন্ত্রী বলছেন, এটা তেমন কিছু না।”   দুদক দুর্নীতির আখড়া দুর্নীতি দমন কমিশন দুর্নীতির আখড়া এমন দাবি করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এরা নিজেরা দুর্নীতিতে জড়িত। তাই এদের কাউকে দায়মুক্তি দেয়ার অধিকার নেই।” তিনি বলেন, “বিদেশে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির মামলা চললেও দুদক অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দিয়ে দিয়েছে।” তিনি বলেন, “এরা আওয়ামী লীগের লোকদের দায়মুক্ত করে বিএনপির নেতাদের মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করে। তাই এই দুদক দিয়ে হবে না, এদের বাতিল করতে হবে।” র‌্যাব-পুলিশ মানুষ মারছে অন্যান্য সমাবেশের মতো কিশোরগঞ্জেও খালেদা জিয়া র‌্যাব ও পুলিশ সরকারের অন্যায় নির্দেশ পালন করে বিএনপির নেতাকর্মীদের হত্যা ও নির্যাঅতন করে বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, “হত্যা, খুন ও নির্যা তনের সঙ্গে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, র্যা ব ও পুলিশ জড়িত।” তিনি বলেন, “র‌্যাব টাকার বিনিময়ে মানুষ হত্যা করে। এটা এখন মানুষ খুনের প্রতিষ্ঠান। এরা যেকোনো সময় যে কাউকে তুলে নিয়ে যেতে পারে। তাই কারো জীবন নিরাপদ নয়। এ জন্য র‌্যাব বাতিল করতে হবে।” তিনি আরো বলেন, “র‌্যাবকে যেন মিশনে নেয়া না হয়। কারণ সেখানে গিয়ে এরা এমন আচরণ করলে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হবে।” পুলিশ রাজধানীতে বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করতে দেয় না এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, “ডিবি পুলিশ চুক্তিতে হত্যা করছে। পুলিশ অন্যায়ভাবে মানুষকে গ্রেফতার করে টাকা পেয়ে ছেড়ে দেয়। টাকা না পেলে শরীরে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে দেয়।” জনগণের সেবক হওয়ার কথা থাকলেও পুলিশ এখন মানুষ হত্যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। ‘পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা নেই’ এমন দাবি করে তিনি বিদেশীদের এই বাহিনীর কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিক্রি না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের নির্মূলে নয়, বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও নীরিহ মানুষের বিরুদ্ধে এসব ব্যবহার করে। মানবাধিকার সংস্থা চাইলে আমরা ছবিসহ এসব দেখাতে পারবো।” বিচার বিভাগ দুই ভাগ সরকার বিচার বিভাগকে দলীয়করণে করেছে এমন অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, “বিচারকরা ন্যায়বিচার করতে পারেন না। বিচার বিভাগ দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের জন্য এক আইন, আর অন্যদের জন্য আরেক আইন।” ১/১১-এর সময়ে করা শেখ হাসিনার মামলা প্রত্যাহার হলেও নিজের মামলা প্রত্যাহার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন খালেদা জিয়া। বিচারকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “একদিন আল্লাহর কাছে যেতে হবে। সুষ্ঠু বিচার না করলে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে।” তবে ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে বিচারকদের সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুদি দেন তিনি। তিন লীগ সবচেয়ে ক্ষমতাধর বিশ্বজিতের প্রসঙ্গ টেনে এই সরকারকে ‘খুনি’ আখ্যায়িত করে খালেদা জিয়া বলেন, পুরো দেশে তারা গুম-খুনের রাজত্ব কায়েম করেছে। সব অপকর্মের সঙ্গে আওয়ামী লীগ জড়িত বলেও দাবি করেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।   তিনি বলেন, “ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ সবচেয়ে ক্ষমতাধর। তারা পুলিশ ও নেতা কারো ধারধারে না।” আওয়ামী লীগের এই অঙ্গসংগঠনগুলো পুলিশের প্রহরায় প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মানুষ হত্যা ও খুন করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ভয়ে ক্ষমতা ছাড়ছে না সরকার জোর করে ক্ষমতা দখল করে আছে, এমন দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, “তারা জানে ক্ষমতা ছাড়লে জনগণ তাদের আস্ত রাখবে না। জনগণ ধাওয়া দেবে। এলাকায় যেতে দেবে না। ক্ষমতা ছাড়ার পর এরশাদের যে অবস্থা হয়েছিল, তার চেয়েও খারাপ হবে-এই ভেবে তারা ক্ষমতা ছাড়তে চায় না।” সময়মতো আন্দোলন জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে নিজের আর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা নেই বলে জানান খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, “আমার কাছে বড় হলো দেশ ও দেশের উন্নয়ন। অতীতে আমি শত চাপেও দেশ ছেড়ে যাইনি।” এ সময় তিনি বলেন, “বাংলাদেশে যেমন নবাব সিরাজউদ্দৌলার জন্ম হয়েছে, তেমনি মীরজাফরের জন্ম হয়েছে। তারা জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেছে। এখন বিএনপি নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। আমাদের শরীরে সিরাজউদ্দৌলার রক্ত আছে। তাই মীরজাফরদের চক্রান্ত সফল হবে না।” নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “গত আন্দোলনে আপনারা অনেক ভূমিকা রেখেছেন। আবারো আমি সময়মতো আন্দোলনের ডাক দেব। তখন আপনারা মাঠে নামবেন। এবং আন্দোলনের মাধ্যমেই নব্য মীরজাফরদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে।” তিনি আরো বলেন, “আমরা পুরাতনকে ভুলে নতুন বাংলাদেশ গড়ব। সেখানে দুর্নীতি থাকবে না। আমরা দেশের চেহারা পাল্টে দেব। ব্যাপক উন্নয়ন করব। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব।” সরকারকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি করার সুযোগ দেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি নেতাকর্মীদের বলেন, “শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি করতে না দিলে ঈসা খাঁর ঢাল-তলোয়ার তো আছেই।” এ সময় তিনি কিশোরগঞ্জে আওয়ামী লীগের বড় বড় অনেক নেতা থাকার পরও রাস্তা-ঘাটসহ কোনো উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের সময়ে আমরা কিশোরগঞ্জে ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। কিশোরগঞ্জের সন্তান ওসমান ফারুক আমাদের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। তিনি ব্যাপক উন্নতি করেছেন।” পুরো বক্তব্যের সময় খালেদা জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছেন তার সপক্ষে বিভিন্ন সংবাদপত্রের কাটিং প্রদর্শন করেন। সমাবেশে বিএনপির নেতাদের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আ স ম হান্নান শাহ, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, ড. ওসমান ফারুক প্রমুখ বক্তব্য দেন। জেলার নেতাদের মধ্যে সভাপতি অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, জেলার ২০ দলের সদস্যসচিব মো. রমজান আলী প্রমুখ। জোট নেতাদের মধ্যে অধ্যাপক মজিবুর রহমান,  কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, মাওলানা মো. ইসহাক, শফিউল আলম প্রধান, সৈয়দ মো. ইবরাহীম, জেবেল রহমান গানি প্রমুখ। সমাবেশ শেষে খালেদা জিয়া সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। নতুন বার্তা/বিইউ/মোআ

No comments:

Post a Comment