রাশিয়ার ইউরেনিয়াম সুপার পাওয়ারের নেপথ্যে ক্লিনটন মো: কামরুজ্জামান বাবলু টাইম নিউজ বিডি, ২৭ এপ্রিল, ২০১৫ ০২:২২:৪৬ ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাম্প্রতিক সময়ে আরেক দফা সুযোগ পেয়েছিলন দেশটির সামরিক শক্তিমত্তা প্রদর্শনের। আর তখনই দেশটির প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম প্রাভদা’র একদিনের সংবাদ শিরোনাম ছিল: “Russian Nuclear Energy Conquers the World” অর্থাৎ “রাশিয়ার নিউক্লিয়ার এনার্জিবিশ্ব জয় করেছে।” “ক্রেমলিনের মুখপাত্র” হিসেবে খ্যাত দেশটির জনপ্রিয় সংবাদ বিশ্লেষণধর্মী ওই পত্রিকাটির এমন শিরোনামে তখন বিশ্বজুড়ে আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল। গত ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয় কিভাবে রাশিয়ার পরমানু শক্তি সংস্থা “রোসাটম” একটি কানাডিয়ান কোম্পানিকে প্রতিযোগিতায় হারিয়ে ইউরেনিয়াম চুল্লির নিয়ন্ত্রন নিয়েছিল। আর এর মধ্য দিয়ে ইউরেনিয়াম জগতে রাশিয়া তার নিয়ন্ত্রন মধ্য এশিয়া থেকে পশ্চিমের আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়। ওই চুক্তির মধ্য দিয়ে রাশিয়ান রোসাটম আন্তর্জাতিকভাবে সর্ববৃহত ইউরেনিয়াম উৎপাদনকারী কোম্পানির একটিতে পরিণত হয়। আর এর ফলে পুতিন বিশ্ব ইউরেনিয়াম সরবরাহ চেইনের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় আসীন হওয়ার পথে আরও একধাপ এগিয়ে যান। কিন্তু ওই গল্পের পেছনে যেই গল্প রয়ে গেছে এবং যা এখনও প্রকাশ হয়নি তা হলো রাশিয়ার ইউরেনিয়াম জগতে নতুনমাত্রায় পদাপর্ণের সাথে শুধু দেশটির প্রেসিডেন্টই জড়িত নয়, এরসাথে আমেরিকার এক সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং একজন নারীও সম্পৃক্ত। আর এই নারীই সম্ভবত হতে যাচ্ছেন বর্তমান বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তির পরবর্তী কান্ডারি। এই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে অবশ্য রয়েছেন কানাডায় খনি শিল্পের কয়েকজন নেতা যারা হলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নানা সেবামূলক দাতব্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ যোগানদাতা এবং তার পরিবারের শুভাকাঙ্খী। ওই দলের সদস্যরাই “ইউরেনিয়াম ওয়ান” নামে বহুল পরিচিত একটি কোম্পানিকে রাশিয়ানদের কাছে বিক্রি করেন এবং এই লক্ষ্যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে বহু অর্থও ব্যয় করেছিলেন। এই বিক্রির ফলে পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় কাজাখাস্তান খনি নিয়ন্ত্রনের পাশাপাশি রাশিয়ানরা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউরেনিয়াম উৎপাদন ক্ষমতার এক পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রন করবে। যেহেতু ইউরেনিয়ামকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্ট্রাটেজিক বা কৌশলগত প্রভাব বিস্তারকারী সম্পদ হিসেবে দেখা হয় এবং এর সাথে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত, তাই একাধিক মার্কিন সরকারী সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটির কাছ থেকে ওই বিক্রি চুক্তিটির অনুমোদন নিতে হয়েছিল।পর্যায়ক্রমে এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং তারপরে ক্লিনটনের স্ত্রী হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটনের অনুমোদন নেয়া হয়। কানাডার দেয়া তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সময়ে পর্যায়ক্রমে তিন দফায় অর্থ লেন-দেনের মধ্য দিয়ে যখন রাশিয়ানরা ইউরেনিয়াম ওয়ান-এর নিয়ন্ত্রন নিচ্ছিলেন, তখনই ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে বড় অঙ্কের অর্থ জমা পড়ে। ইউরেনিয়াম ওয়ানের চেয়ারম্যান তার পারিবারিক ফাউন্ডেশন ব্যবহার করে চারটি ডোনেশান বা অনুদানের ব্যবস্থা করেন যার মোট অর্থের পরিমান ২.৩৫ মিলিয়ন ডলার। ক্লিনটন পরিবার এই অনুদানের কথা জনসম্মুখে প্রকাশ করেননি। অথচ হোয়াইট হাউসে ওবামা ও মিসেস ক্লিনটনের মধ্যে এই মর্মে চুক্তি ছিল যে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে আসা সব অনুদানের কথাই জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে। অবশ্য এ সময়ে অন্যান্যদের কাছ থেকেও অনুদান অব্যাহত থাকে। ইউরেনিয়াম ওয়ানে রাশিয়া নিজেকে প্রধান নিয়ন্ত্রক ঘোষণা করার স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ক্রেমলিনের সাথে সংশ্লিষ্ট রাশিয়ার একটি বিনিয়োগ ব্যাংকের কাছ থেকে বিল ক্লিনটন “Moscow speech” অর্থাৎ মস্কো বক্তৃতাবাবদ ৫ লাখ ডলার গ্রহণ করেন। আর এই ব্যাংকটি ইউরেনিয়াম ওয়ানের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার সাথে সম্পৃক্ত ছিল। এ সময় রোসাটম এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকার-উভয়ই ইউরেনিয়াম ওয়ান কোম্পানির সম্পত্তিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রন রাশিয়ানদের ওপর ছেড়ে দেয়ার অঙ্গিকার করেন। জরিপ অনুযায়ী অবশ্য ওই অঙ্গীকার বার বার লঙ্ঘন হতেও দেখা যায়। বেশ কিছু সাক্ষাতকার এবং কানাডা, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পাবলিক রেকর্ডস ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কাগজপত্র ঘাটাঘাটি করে ইউরেনিয়াম ওয়ান চুক্তির বিষয়ে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়।ইউরেনিয়াম ওয়ান এবং ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের মধ্যে কতিপয় যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন গবেষক ও লেখক পেটার সুয়েইজার। তিনি শিগগিরই প্রকাশ হতে যাওয়া “ক্লিনটন ক্যাশ” বইয়ের লেখক এবং ডানপন্থী হুভার ইনস্টিটিউটের সাবেক ফেলো। সুয়েইজার তার বইয়ের কিছু উপাদান নিউইয়র্ক টাইমস কর্তৃপক্ষকে সরবরাহ করেছেন। এ সংক্রান্ত টাইমসের প্রতিবেদন তৈরির সময় ওই বইয়ের সরবরাহকৃত উপাদানেরও চুরচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটা ঠিক যে ইউরেনিয়াম ওয়ান চুক্তির সাথে এসব অনুদানের মধ্যে কতটা যোগসাজশ ছিল তা জানা যায়নি, তবে আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্টের অধীনে ক্লিনটন ফাউন্ডেশন তার ২৫০ মিলিয়ন ডলারের অ্যাসেট বা সম্পত্তি গড়ার ক্ষেত্রে প্রধানত বিদেশী অনুদানের ওপরই নির্ভরশীল ছিলেন। আর এই প্রেসিডেন্টের স্ত্রী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেশটির কুটনৈতিক নীতিমালার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে ওই ফাউন্ডেশনের ডোনারদের নানা সুবিধা প্রাপ্তিতে সাহায্য করেছিলেন। এদিকে, আসন্ন রাষ্ট্রপতি পদে মিসেস ক্লিনটনের প্রচারাভিযানের মুখপাত্র ব্রিয়ান ফালুন সম্প্রতি বলেন, কেউ এ ব্যাপারে ন্যূণতম প্রমান দিতে পারবেন না যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে অনুদান প্রদানকারীদের সুবিধা দিতে হিলারি ক্লিনটন কোন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন সংস্থা এবং কানাডার সরকার ওই চুক্তি সম্পন্ন করেছিল এবং এ ধরনের বিষয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নিচের দিকের কর্মকর্তাই সুরাহা করে থাকেন। ব্রিয়ান ফালুন আরও বলেন, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের দিকে এই মর্মে অঙ্গুলি প্রদর্শনের কোন ভিত্তি নেই। ইউরেনিয়াম ওয়ান চুক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের রিভিউ কার্যক্রমে হিলারির অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন। আমেরিকার রাজনৈতিক প্রচারাভিযানে বিদেশী ডোনেশন বা অনুদান গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে কোন ফাউন্ডেশনে বিদেশীরা অনুদান দিতে পারেন।মিসেস ক্লিনটন যখন প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দীতার ঘোষণা দিলেন, তখন ক্লিনটন ফাউন্ডেশনও তার দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে যেন অনেকটাই ঘুরে দাড়ালো। বিদেশী সরকারের কাছ থেকে ডোনেশান বা অনুদানের খাত অনেকটাই সংকুচিত করা হয়। শুধুমাত্র স্বাস্থ্য সেবা খাতে ফাউন্ডেশনটির কার্যক্রমে অনুদান দেয়া ছাড়া বাকি সব খাতে অনুদান গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের এমন নীতিমালার ফলে ওবামা প্রশাসনের সাথে মিসেস ক্লিনটনের আরও উদারভাবে যেকোন চুক্তি করার পথ প্রশস্ত হয়ে গেল। এর ফলে দেশটির শীর্ষ কুটনীতিকের দায়িত্ব পালনের সময় সব ধরনের বিদেশী অনুদান গ্রহণের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা তাকে মানতে হতো সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা তার জন্য অনেকটাই সহজ হয়ে গেল। যাই হোক ইউরেনিয়াম ওয়ান চুক্তির ফলে ডোনেশানের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি অনেকটাই স্পষ্টভাবে উঠে আসলো জনসম্মুখে। তবে, বিদেশী বিভিন্ন উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ফাউন্ডেশনের অনুদান গ্রহণ তো আর থেমে থাকবে না। সেক্ষেত্রে ইউরেনিয়াম ওয়ানের মতো হয়তো অন্য কোন বিদেশী সরকার বা যে কেউ নিজ স্বার্থ আদায় করে নিবে যা হয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দেবে। যখন ইউরেনিয়াম ওয়ান চুক্তির বিষয়টি অনুমোদিত হয় তখনকার ভৌগলিক রাজনীতির সাথে এখনকার রাজনীতির বিস্তর ফারাক রয়েছে। রাশিয়ার সাথে বর্তমান ওবামা প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। তবে নি:সন্দেহে এই চুক্তিটি কৌশলগতভাবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তিটিকে রাশিয়ার জন্য আমেরিকার আশীর্বাদ হিসেবেই দেখা হয়। রাশিয়ার পরমানু সংস্থা রোসাটমের প্রধান নির্বাহী সার্গেই ক্রিয়েনকোর সাথে চুক্তির পর পরই পুতিনের এক সাক্ষাতকারের সময়ও বিষয়টি আলোচনায় আসে। তখন ক্রিয়েনকো পুতিনকে বলেছিলেন, “আমেরিকার পরমানু শক্তির ২০ শতাংশই আমাদের নিয়ন্ত্রনে থাকবে, অতীতে কি কেউ এটা কল্পনাও করতে পারতো?” বর্তমানে রাশিয়ার ক্রাইমিয়া দখল এবং ইউক্রেনে আগ্রাসনের পটভূমিতে মস্কো-ওয়াশিংটন সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে ঠান্ডা লড়াই যুগের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আর তখনই একটি চুক্তি পুতিনকে পরমানুর মতো শক্তিশালী সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব প্রতিপত্তি প্রদর্শনের সুযোগ করে দিল। “আমরা কি সতর্ক হবো? অবশ্যই।” মিসেস ক্লিনটনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী কুটনীতিক মিখাইল ম্যাকফাওয়েল এভাবেই তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তবে তিনি ইউরেনিয়াম ওয়ান চুক্তির বিষয়ে তাকে আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি বলেও জানান তিনি। “আমরা এই অঙ্গনে পুতিনের একক প্রভাব নিশ্চয়ই মেনে নেব না। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা কখনই কোন বিষয়ে পুতিনের ওপর নির্ভরশীলতা কামনা করতে পারি না।” আমেরিকার অভিজ্ঞ কুটনীতিক মিখাইল ম্যাকফাওয়েলের রাশিয়ার ব্যাপারে এই কঠোর মনোভাব শেষ পর্যন্ত কতটা কাজে আসবে-বিশ্ববাসী এখন হয়তো সেই হিসেব-নিকেশই কষছেন। কেবি
No comments:
Post a Comment